বিদায়ী ২০২৩ সালটাকে কীভাবে মনে রাখবেন প্যাট কামিন্স? ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে হার মেনে মায়ের চলে যাওয়ার বছর নাকি ক্রিকেটার হিসেবে সব পাওয়ার বছর? মার্চে মাকে হারিয়েছেন। গভীর রাতের পর যেভাবে ভোরের আলো আসে, তেমনি জীবনের সবচেয়ে শোকগ্রস্ত সময়টা কাটানোর পর জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়টা পার করছেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক। টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা, অ্যাশেজ ধরে রাখা, ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়, আইপিএলে আকাশছোঁয়া দাম আর বছরের শেষটা হলো পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭৯ রানে পাওয়া জয়ে যেখানে দুই ইনিংসেই নিয়েছেন ৫টি করে উইকেট। মোহাম্মদ রিজওয়ান আর আগা সালমানের জুটিটা যখন পাকিস্তানকে বিরল এক জয়ের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল, তখনই কামিন্স তছনছ করে দিয়েছেন সেই সম্ভাবনা।
বক্সিং ডে টেস্টের চতুর্থ দিন। আগের দিনের ৬ উইকেটে ১৮৭ রানের সঙ্গে আরও ৭৫ রান যোগ করে অলআউট হয় ২৬২ রানে। ১৬ রানে অপরাজিত থাকা অ্যালেক্স ক্যারি করেন ৫৩ রান, কামিন্স আউট হন ১৬ রানে আর মিচেল স্টার্ক ১১ রানে। পাকিস্তানের সামনে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের লক্ষ্য ৩১৭ রানের। এই লক্ষ্যে শুরুতেই হোঁচট খায় পাকিস্তান, পঞ্চম ওভারেই আউট হয়ে যান ওপেনার আব্দুল্লাহ শফিক। আরেক ওপেনার ইমাম-উল-হককে নিয়ে শান মাসুদ খানিকক্ষণ হাল ধরলেও কামিন্স ভাঙেন এই জুটি। ১২ রান করে কামিন্সের বলে এলবিডব্লিউ হন ইমাম। বাবর আজম আর শান মাসুদ মিলে ৬১ রানের জুটি গড়ে ফের যখন বিপদের গন্ধ বাড়াচ্ছেন, তখন আবারও কামিন্সই ত্রাতা। এবারে মাসুদ ৬০ রানে সিøপে স্টিভেন স্মিথের তালুবন্দি । চা-বিরতির খানিক বাদে বাবর আজমকে ৪১ রানে থামিয়ে দেন জশ হ্যাজেলউড, ৫ ওভার পর স্টার্কের বলে কাট করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন সাউদ শাকিল। আগা সালমানকে নিয়ে মোহাম্মদ রিজওয়ান গড়ে তোলেন প্রতিরোধ। ষষ্ঠ উইকেটে দুজনের জুটিতে আসে ৫৫ রান। এরপরই সেই নাটকীয় মুহূর্ত।
কামিন্সের বাউন্সারে ডাক করেছিলেন রিজওয়ান, মাথা বাঁচলেও বল ব্যাট আর মাথার মাঝদিয়ে গেল উইকেটরক্ষকের হাতে। একটা শব্দও হলো। রিজওয়ান কনুইয়ের নিচে হাত ঘষছেন, মনে হচ্ছে বল লেগেছে সেখানেই। আম্পায়ারও কোনো সংকেত দিলেন না। আত্মবিশ্বাসী কামিন্স নিলেন রিভিউ, জুম ইন করে টিভি আম্পায়ার দেখলেন বল লেগেছে রিজওয়ানের গ্লাভসের এলাস্টিক ব্যান্ডে। রিজওয়ান দুই হাতেই ব্যাট ধরেছিলেন, হাতে গ্লাভস আর বল লেগেছে গ্লাভসের একটি অংশে। তাই আম্পায়ার আউট দিলেন রিজওয়ানকে। যদিও এই সিদ্ধান্তে খুবই অসন্তুষ্ট ছিলেন রিজওয়ান, আম্পায়ারকে নিজের হাতে বলের ঘষা লাগার দাগও দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু আর ভাগ্য বদলায়নি তার; বরং রিজওয়ানের বিদায়ের পর তাসের ঘরের মতোই ধসে যায় পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের বাকি অংশ। দলীয় ২১৯ রানে রিজওয়ানের ষষ্ঠ উইকেটের পতন, ২৩৭ রানেই অলআউট পাকিস্তান। দলের শেষ চার ব্যাটসম্যানের রান শূন্য। ১৭ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান ম্যাচ হারল ৭৯ রানে। সেই সঙ্গে টেস্ট সিরিজ জিতে নিল অস্ট্রেলিয়া।
কামিন্স দ্বিতীয় ইনিংসে নিলেন ৪৯ রানে ৫ উইকেট, ম্যাচে তার শিকার ১০ উইকেট। এই ১০ শিকার কামিন্সকে জায়গা করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের তালিকার সেরা দশে। ৫৭ টেস্টে ২৫২ উইকেট নিয়ে কামিন্স চলে এসেছেন দশম স্থানে। এ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কামিন্সের শিকার ৫৯ উইকেট; টেস্টে ৪২ আর ওয়ানডেতে ১৭।
এ বছর টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ, অ্যাশেজ, ওয়ানডে বিশ্বকাপ; মর্যাদার অনেক স্মারকই উঠেছে কামিন্সের হাতে। সেই জাদুকরি ডানহাত কাল এমসিজিতে গড়ল অন্য এক কীর্তি। প্রথম অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক হিসেবে টেস্টে ১০ উইকেট পাওয়ার কীর্তিটা অ্যালান বোর্ডারের, ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনি সিডনি টেস্টের দুই ইনিংসে নিয়েছিলেন যথাক্রমে ৭ ও ৪ উইকেট। কামিন্স প্রথম অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক, যার দুই ইনিংসেই আছে ৫ উইকেট।
অনেক কীর্তির পর ম্যাচসেরা এবং বিজয়ী অধিনায়ক হিসেবে মাইক্রোফোনের সামনে এসে কামিন্স বলেছেন, ‘এখানে খেলতে সব সময়ই ভালোবাসি, বক্সিং ডে হচ্ছে বছরের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট। আমার মনে হয় ২০২৩ সালটাকে আমরা বিশেষ একটা বছর হিসেবেই দেখব।’
