পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সুযোগ কতটুকু

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২২ এএম

আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা। বুধবার (০৩ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের ক্রেডিনশিয়াল হলে ডাকযোগে এই ভোট দেন।

বাংলাদেশে নির্বাচনী আইনে ভোটদানের ক্ষেত্রে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এতদিন তা কাগজে সীমাবদ্ধ ছিল। নানা আইনি জটিলতা ও প্রচারের অভাবে পোস্টাল ব্যালটের ব্যবহার দেখা যায়নি। এবারই প্রথম এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক ভোট দিলেন।

পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা

পোস্টাল ব্যালট কি

সাধারণত ভোটের দিন শারীরিকভাবে সরাসরি ভোটদানে অসমর্থ ভোটাররা আগে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করে তা ডাকযোগে পাঠিয়ে যে ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, তাকে পোস্টাল ব্যালট বলা হয়। যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে চান তাদের নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আগে থেকে নিবন্ধন করতে হয়। এই নিবন্ধিত ভোটাররা সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে কমিশন নির্ধারিত একটি ফরমে অগ্রিম ভোট দিতে পারেন।

দ্বাদশ নির্বাচন কেন্দ্র করে এবার শুরু থেকেই পোস্টাল ব্যালটে ভোটের বিষয়টি জনপ্রিয় করতে প্রচার শুরু করে ইসি। এমনকি বিদেশি মিশনেও যোগাযোগ করে প্রচারণা চালাতে বলা হয়। ইসি কর্মকর্তারা জানান, আইনগতভাবে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও নানা ধরনের জটিলতায় এ নিয়ে আগ্রহ থাকে না ভোটারের। অসচেতনতার কারণে এ প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ ভোটার অংশ নেয় না।

গত ২২ নভেম্বর ইসির জনসংযোগ পরিচালক শরিফুল আলমের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সদস্য, জেলখানায় আটক ব্যক্তি ও প্রবাসী ভোটাররা পোস্টাল ব্যালট চাইলে তাদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে আবেদন করতে হবে। তবে আবেদনের সময় শেষ হয়ে গেলেও এই পদ্ধতিতে কতজন ভোট দিয়েছেন তা জানা যায়নি।

যা বলছেন বিশ্লেষকরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালট আমাদের দেশে একেবারেই নতুন। এই পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা নেই। এ নিয়ে ইসি কিংবা সরকারের কোনো প্রচারণাও চোখে পড়েনি। তবে এই পদ্ধতি জনপ্রিয় করা গেলে এর ইতিবাচক দিক রয়েছে।’
 
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ায় এই পদ্ধতি জনপ্রিয় হবে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নির্বাচন কেন্দ্র করে সবসময় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ফলে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে থাকা অনেক নাগরিকও ভোট দিতে ভয় পান। 

বাংলাদেশের ভোটারদের একটা বড় অংশ প্রবাসী, যারা বছরের পর বছর ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশের বাইরে থাকায় তারা  জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন না। একইভাবে কারাবন্দী নাগরিকদেরও বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। যারা চাকরিসূত্রে বিভিন্ন এলাকায় থাকেন কিন্ত অন্য এলাকার ভোটার যাতায়াতের ভোগান্তির কথা ভেবে তাদের একটা বড় অংশ ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্ত পোস্টাল ব্যালটে ভোট চালু ও জনপ্রিয় হলে এই সংকট দূর হবে। 

এছাড়া অসুস্থ ও প্রবীণ নাগরিকদের কষ্ট করে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হয়, যা তাদের ভোটবিমুখ করে তোলে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পোস্টাল ব্যালটে ভোট জনপ্রিয় করা গেলে এবং পদ্ধতি সহজ হলে ভোটের হার বাড়তে পারে।

১৯৯৮ সালে উচ্চ আদালতে ভোটাধিকার চেয়ে মামলা করেছিলেন প্রবাসীরা। সেই মামলার রায়ে আদালত বলেছিলেন, ‘প্রবাসীদের ভোট দিতে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই।’ ২০০৭ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেই সভায়ও প্রবাসীরা ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। 

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) পরিচালক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি খুব ইতিবাচক। উন্নত বিশ্বে কিন্ত দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতিতে নাগরিকরা তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। সম্ভবত আমাদের দেশে এবারই প্রথমবার ব্যালট ভোট দেওয়া হলো। রাষ্ট্রের অভিভাবক এই পদ্ধতি ব্যবহার করায় এর গুরুত্ব ও প্রচার বাড়বে। কিন্ত এই পদ্ধতির বিষয়ে আরও প্রচার প্রয়োজন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘একাধিক কারণে পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন। যেমন- অনেক নাগরিক কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন কিন্ত তার ভোটকেন্দ্র বা গ্রামের বাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ফলে পরিবার নিয়ে ভোট দিতে যেতে আর্থিক ক্ষতি হয়। আবার ছুটিও বেশি থাকে না। তাই অনেকেই ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আমাদের ভোটকেন্দ্রে যে সহিংসতা হয় তাতেও আতঙ্কিত হয়ে ভোটবিমুখ হচ্ছেন অনেকে। প্রবাসী ভোটারদের পক্ষে দেশে এসে ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না ফলে তারা ব্যালটে আগ্রহী হবেন। বয়স্ক ও অসুস্থ নাগরিকদের ভোটে আলাদা আগ্রহ থাকে, এই পদ্ধতি সহজ হলে তারা এই সুযোগ নেবেন।’

নির্বাচন কমিশনের লোগো

জানে না প্রবাসীরা

বরাবরের মতো এবারও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিষয়টি জানতেন না বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশী প্রবাসীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সুমন আলম। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে সবশেষ ভোট দিয়েছিলাম। এরপর জীবিকার তাগিদে নানা দেশ ঘুরে যুক্তরাজ্যে আসি। মাঝে কয়েকবার দেশে গেলেও ভোট দিতে পারিনি। অথচ ভোট নিয়ে প্রবাসীদের আগ্রহ কোনো অংশে কম নয়। পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার যে সুযোগ আছে তা জানতাম না।’

একই কথা জানান, সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ আল জাবের। তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের কেউ গুরুত্ব দেয় না। আমরা বিদেশ আসি, টাকা পাঠাই, শেষ। আমাদের আবার কিসের অধিকার? পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, দূতাবাসও জানায়নি। সুযোগ থাকলে ভোট দিতে আমার মতো অনেক প্রবাসীই আগ্রহী হবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত