নির্বাচন পরবর্তী ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৫৩ পিএম

খুলনায় দুটি সংসদীয় আসনে (খুলনা-৪ ও ৫) সদ্য সমাপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। নৌকার কর্মী-সমার্থকরা পরাজিত দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক ও নির্বাচনী এজেন্টদরকে মারপিট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান-বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলনে খুলনা-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ফুলতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আকরাম হোসেন এবং খুলনা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এস এম মোত্তর্জা রশিদী দারা এমন অভিযোগ করেন। নিবার্চন পরবর্তী এ সহিংসতার জন্য নিবার্চিত সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও সালাম মূর্শেদীকে দায়ি করেছেন এই দুই প্রার্থী।

বেলা ১২টায় সংবাদ সম্মেলনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন বলেন, ডুমুরিয়া-ফুলতলা (খুলনা-৫) আসনে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত বিজয়ী প্রার্থী নারায়ন চন্দ্র চন্দের কর্মী-সমার্থকরা ১৩/১৪ টি সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে।

কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করে আকরাম বলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার শোভনা বিরাজময়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তার এজেন্ট ছিল সাবিনা বেগম। ভোটের দিন সন্ধ্যায় ইউপি চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত বৈদ্যের নেতৃত্বে সাবিনার বাড়ি ও দোকান ঘরে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। তাকে মেরে গুরুতর আহত করে হামলাকারীরা। ডুমুরিয়ার পল্লীশ্রী কলেজ কেন্দ্রে ঈগলের এজেন্ট প্রিয়াংকা মন্ডল, তার স্বামী প্রকাশ মন্ডল ও শ্বশুর-শাশুড়িকে মারপিট করা হয়। বাদুরগাছায় নয়ন গাজী ও তার স্ত্রী খাদিজা বেগমকে মারপিট ও প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর ভাঙচুর করা হয়। সাহস ইউনিয়নে নোয়াকাঠী গ্রামে নৌকার সমর্থক ইলিয়াস ফকিরের নেতৃত্বে তুহিন শেখ, আদম শেখ ও পল্লী চিকিৎসক ওহিদুল শেখকে পিটিয়ে আহত করা হয়। এদের মধ্যে তুহিনের মাথা গুরুতর জখম হয়েছে। ডুমুরিয়া সদরে মির্জাপুর গ্রামে দিবাশীষ মেম্বর, গনেশ বৈরাগী ও আশিষ মহালদারের নেতৃত্বে তার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক স্কুল শিক্ষক শ্যামপদ মন্ডলের বাড়িতে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা করা হয়। রুদাঘরা চেয়ারম্যান তৌহিদ গাজীর নেতৃত্বে তার ভাইপো স্বাধীন, মাজিন ও রবিউলসহ কয়েকজন ৭ থেকে ৮ টি মোটরসাইকেলে এসে শাহপুর মাছের আড়তের সামনে রুদাঘরা গ্রামের ফজর সরদারের ছেলে বাবলু সরদারকে মারপিট করে আহত করে। মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর গ্রামের শহর আলী, বেতাগ্রামের শহিদুল ইসলাম ও মজিদ গাজীকে মারপিট করে গুরুতর আহত করা হয়। মাগুরখালী ইউনিয়নের কাঠালিয়া গ্রামে নিতিশ মন্ডল ও বিমল কৃষ্ণ মন্ডলের বাড়ি ও দোকান ভাঙচুর করা হয়। মাগুরাঘোনার মতি মেম্বরের নেতৃত্বে রমজান সরদারকে মারপিট করা হয়েছে। শোভনার গাবতলায় আব্বাস খান, দিনেশ মল্লিক ও তার ছেলে সত্য মল্লিকের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভান্ডারপাড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান গোপাল চন্দের নেতৃত্বে হাজিবুনিয়া গ্রামের শম্ভু মন্ডল, পাপন মন্ডল ও পেড়িখালী গ্রামের পরিমল বাছাড়কে মারপিট করা হয়। কিন্তু উক্ত ঘটনা পুলিশ সুপার ও স্থানীয় থানার ওসিকে জানালেও সহিংসতা বন্ধে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না তারা।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বিজয়ী সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, পরাজিত হয়ে শেখ আকরাম হোসেন অনেক কিছুই বলছেন। তার অভিযোগ সবই মিথ্যা। কর্মীদের বোঝানোর জন্যই সে এ সব কথা বলছেন। খুলনা-৫ আসনের পরিবেশ খুব শান্ত রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনাও খোঁজ নিতে পারেন।

অপরদিকে দুপুর দেড়টায় খুলনা প্রেসক্লাবে আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে খুলনা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এস এম মোত্তর্জা রশিদী দারা অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাম মূর্শেদী নির্বাচনে অর্থ ব্যয়ের নীতিমালা ভঙ্গ করে বিপুল অর্থ ব্যয়, ক্ষমতা প্রয়োগ ও ভোট না দিলে কার্ড বাতিলের ভীতি প্রদর্শন করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন।

দারা নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার ২২টি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, মুর্শেদী বিজয়ী হওয়ার পর তেরখাদা উপজেলার ৩নং ছাগলাদাহ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম দীন ইসলামের নেতৃত্বে তার কর্মী এসকেন্দ শেখকে গুরুতর জখম করা হয়। আজগড়া আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের নির্ধারিত সীমার বাইরে বাদশা মল্লিক ও তার বাহিনীর লোকজন কেটলির ভোটার লিস্ট সরবরাহকারী শিল্পী, তার ছেলে ও বাবা মোঃ আব্দুল কুদ্দুস তালুকদারকে মারধর ও অশ্রাব্য ভাষায় গালি দেন। রুপসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আসাদুজ্জামান বাবরের নেতৃত্বে দেব প্রসাদ কুন্ডুকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়। তার মাথায় পাঁচটি সেলাই লেগেছে। দেয়াড়ায় রেজাল্ট ঘোষণার পর মিরাজ মেম্বারের নেতৃত্বে তপু নামের একজনকে মারপিট ও তার স্ত্রী গায়ে হাত দেন। তপু এখন খুলনা সদর হাসপাতালে ভর্তি আছে। ইলাইপুর ফকির বাড়ির মোড়ে কামালকে মারপিট করে মিকাইলের নেতৃত্বে সোহেল মেম্বারের লোকজন। বাবর মেম্বারের ছেলে বাঁধনের নেতৃত্বে সঙ্গবদ্ধদল জাবুসা স্কুল মোড়ে পান দোকানদার কেটলি প্রতীকের সমর্থক মামুন ও রশিদ কে মারপিট করে। শেখপুরার সাবেক মেম্বর আশরাফ, মুক্তিযোদ্ধা নওয়াব আলি ও তার ছেলে টিটু কেটলির পক্ষে থাকার কারণে তাদের ঔষধের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। খায়রুল হাওলাদারের দোকানে তালা মেরে দিয়েছে সোহেল মেম্বার। এছাড়াও রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলা এলাকায় নিবার্চন পরবতীর্ সহিংস, হুমকি-ধামকির ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিজয়ী নৌকার প্রার্থী আব্দুস সালাম মূর্শেদী বলেন, উনি (স্বতন্ত্র প্রার্থী দারা) ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন। অনেক সময় ব্যত্তিগত বিরোধ রাজনৈতিকভাবে দেখানো হচ্ছে। তবে আমি সবার এমপি। ভোটারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। সুতরাং কাউকেই মারপিট, হুমকি-ধামকী ও হয়রানি করার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ ব্যাপারে খুলনা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা যথেষ্ট ভালো আছে। যে দুই-তিনটি ছোট ঘটনা ঘটেছে তা খতিয়ে দেখছি। সামনে এধরনের ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য জেলা পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত