ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায় রানওয়ে, বিমানের ওঠানামায় সমস্যা

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:২৩ পিএম

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর রানওয়েতে বসানো হয়নি অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি, যদিও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। প্রতি শীতে রানওয়ের সরঞ্জামাদি নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু কাজ হয় না। ফলে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি দিয়েই রানওয়ের কার্যক্রম চালায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

এ কারণে বিমানের ফ্লাইটের ওঠানামা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলোকে। গত এক মাসে শতাধিক ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারেনি। যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। হযরত শাহজালাল, শাহআমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সমস্যা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, থার্ড টার্মিনালের কাজ শেষ হওয়ার পরই রানওয়েতে উন্নত যন্ত্রপাতি বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্যাটাগরি-২-এ উন্নীত করতে বছর দুয়েক আগে কাজ শুরু হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি বসালে ঘন কুয়াশা থাকলেও এয়ারলাইনসের পাইলটরা সহজেই বিমান ওঠানামা করতে পারবেন। শাহজালালে আরেকটি নতুন রানওয়ে তৈরির কাজও শুরু হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, প্রতি বছরের মতো এবারও ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা কমে যাওয়ায় দেশের বিমানবন্দরগুলোর রানওয়েতে প্রায়ই ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারছে না। পাশের দেশগুলোতে বিমান নামাতে বাধ্য হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। এতে একদিকে টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে ফ্লাইট শিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না।

ঘন কুয়াশার কারণে গত এক সপ্তাহে শাহজালাল বিমানবন্দরে অন্তত ২০টি ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারেনি। বাধ্য হয়ে ফ্লাইট নামাতে হয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।

আইএলএস ক্যাটাগরি-২ চালু না হওয়া পর্যন্ত ভোরের ফ্লাইট রি-শিডিউল করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রানওয়েতে উন্নতমানের সরঞ্জামাদি বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শীত এলেই এ সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। আশা করি, দ্রুত সময়ে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা যাবে।’

সিভিল অ্যাভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘন কুয়াশায় দৃষ্টিগ্রাহ্যতা বা ভিজিবিলিটি কমে গেলেও বিশ্বের প্রায় সব বিমানবন্দরেই যন্ত্রের সাহায্যে আইএলএস পদ্ধতিতে অবতরণ-উত্তরণ কাজ চালানো হয়। বিমানবন্দরের রানওয়ে যদি ৫০০ মিটার পর্যন্ত দেখা যায়, তাহলে আইএলএস ক্যাটাগরি হতে হবে ‘২’। আর দৃষ্টিসীমা বা দৃষ্টিগ্রাহ্যতা ৫০ থেকে শূন্য মিটার হলে প্রয়োজন আইএলএস ক্যাটাগরি-৩।

তিনি বলেন, ‘ঢাকাসহ তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো ক্যাটাগরি-১-এই রয়ে গেছে, যার কারণে ৮০০ মিটারের কম দৃষ্টিগ্রাহ্যতা হলে ফ্লাইট ওঠানামা করা সম্ভব হয় না। এতে একদিকে আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে ফ্লাইট শিডিউলে বিপর্যয় ঘটে। ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হচ্ছে, তখনই জ¦ালানি পুড়ছে। এতে ব্যয়ও বাড়ছে এয়ারলাইনসগুলোর। ফ্লাইট শিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না বলে সুনাম নষ্ট হচ্ছে বিমান সংস্থাগুলোর।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘ঘন কুয়াশার কারণে গত শনিবার কোনো এয়ারলাইনস সৈয়দপুর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা করতে পারেনি। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে তিনটি ফ্লাইটের প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েন। পাঁচ দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি ওই এলাকায়। ফলে প্রায় প্রতিদিন সকাল ও রাতের ফ্লাইট শিডিউল মেনে চলাচল করতে পারেনি। বিমানবন্দরের চারপাশে ঘন কুয়াশা ছিল। ভিজিবিলিটি ছিল মাত্র ৫০০ মিটার, উড়োজাহাজ ওঠানামায় প্রয়োজন কমপক্ষে ২ হাজার মিটার। নভোএয়ার, ইউএস-বাংলা ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট এলোমেলো হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে শাহজালালে নামতে না পেরে কয়েক ঘণ্টা আকাশে ঘোরাঘুরি করে একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে ও তিনটি ফ্লাইট কলকাতা বিমানবন্দরে নামতে বাধ্য হয়েছে। এক মাসে শতাধিক ফ্লাইট ওঠানামা করতে পারেনি।’

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রানওয়েতে উন্নতমানের সরঞ্জাম বসানো হবে। আমরা আরেকটি রানওয়ে করারও পরিকল্পনা করেছি। রানওয়ে অন্তত ২-ক্যাটাগরিতে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরকে আইএলএস ক্যাটাগরি-২-এ উন্নীত করতে ২০২২ সালে কাজ শুরু হয়েছে। রানওয়ের বাতি বসানোসহ ইলেকট্রিক সিস্টেমের কাজ শেষ হয়েছে। এখন বাকি কন্ট্রোল প্যানেল বসানো ও ইন্টারফেসিংয়ের কাজ। আশা করি দ্রুত আমাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করা হবে।’

নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শূন্য দৃষ্টিগ্রাহ্যতার মধ্যেও অনেক বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা করতে পারে। অথচ আমরা এখনো ক্যাটাগরি-১-এর মধ্যে পড়ে আছি। ফ্লাইট ডাইভার্ট হলেই খরচ বেড়ে যায় প্রায় দ্বিগুণ। আমরা ক্যাটাগরি-২ দাবি করছি। কারণ কম দৃষ্টিগ্রাহ্যতায় ফ্লাইটের ওঠানামা ব্যাহত হয়।’

জানা গেছে, তিন ধরনের আইএলএস ক্যাটাগরি হয়। ক্যাটাগরি-১, ক্যাটাগরি-২ ও ক্যাটাগরি-৩। রানওয়েতে ক্যাটাগরি-৩-এর প্রযুক্তি বসানো হলে উড়োজাহাজ অবতরণের সময় বৈমানিকরা শতভাগ দৃশ্যমানতা পান। ক্যাটাগরি-২ সংবলিত রানওয়েতে ন্যূনতম দৃষ্টিগ্রাহ্যতা হয় ৫০০ মিটার। আর ক্যাটাগরি-৩-এ দৃষ্টিগ্রাহ্যতা ৫০ মিটার থেকে শূন্য মিটার।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শফিউল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহজালালের রানওয়ের আইএলএস-২-এর কাজ সম্পন্ন হয়নি। ফলে কুয়াশা ঘন হলেই ফ্লাইট ডাইভার্ট করতে হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। শিডিউল বিপর্যয়ও ঘটছে, যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি ফ্লাইটের শিডিউল ঠিক রাখতে।’

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জেনারেল ম্যানেজার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুয়াশার কারণে ফ্লাইটের শিডিউল ঠিক রাখা যাচ্ছে না। রানওয়ের উন্নত সরঞ্জামাদি দ্রুত বসানো না হলে সমস্যার সমাধান হবে না। ফ্লাইটের ওঠানামা সঠিক সময়ে না হওয়ায় আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত