ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। নানান সমস্যায় জর্জরিত হলটিতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন ছাত্রীরা। সিট সংকটের কারণে এক কক্ষে ছয়-সাতজন করে থাকতে হয় ওই হলে আসন বরাদ্দ পাওয়াদের। হলে নেই পর্যাপ্ত রিডিংরুম ও ওয়াশরুমও। আর হল থেকে ক্যাম্পাসে যাতায়াতের জন্য পরিবহন সংকট তো আছেই। বারবার আন্দোলন করেও মেলেনি সমাধান। এর মধ্যে প্রশাসন প্রতিকক্ষে আটজনকে থাকার নির্দেশনা দিয়ে তার বাস্তবায়নও করেছে। সব মিলিয়ে হলটিতে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ওই হলে সিট বরাদ্দ পাওয়াকে রীতিমতো ‘অভিশাপ’ মনে করেন শিক্ষার্থীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল। বছরের পর বছর এই হলের শিক্ষার্থীরা সিট সংকটে ভুগছেন। হলের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত সিকদার মনোয়ারা ভবনের অতিথি কক্ষে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী বসবাস করছেন। তবে সর্বশেষ গত মাসে কিছু শিক্ষার্থীকে সেখান থেকে অন্যান্য হলে স্থানান্তর করে প্রশাসন। আর কিছু শিক্ষার্থীকে চলতি মাসে হলের বিভিন্ন রুমে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে বাধে আরও বড় বিপত্তি। যেখানে প্রতি রুমে চারজনের জায়গায় ছয়জন থাকেন, সেখানে এখন থেকে গাদাগাদি করে আটজনকে থাকার নির্দেশনা দেয় হল প্রশাসন। শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার রাতে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। পরে রাত ২টায় উপাচার্যের আশ্বাসে হলে ফিরে যান তারা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আমরা সিট সংকটের সমাধান চাইলাম আর প্রশাসন সেটি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের হলে ভালো কোনো রিডিংরুম নেই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রিডিংরুম বাদ দিলে আমাদের পড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। রুমের মধ্যে গাদাগাদি করে থাকতে হয়, রান্না করতে হয়। সেখানে পড়ার কোনো পরিবেশ নেই। নেই পর্যাপ্ত ওয়াশরুম। হলের খাবারের মানও ভালো না। এ ছাড়া দায়িত্বরত আবাসিক শিক্ষক এবং কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহারও রয়েছে। এটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের পরিবেশ হতে পারে না।
এদিকে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী, বঙ্গমাতা ও সুফিয়া কামাল হলের প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র দুটি বাস বরাদ্দ রয়েছে। সকালে প্রায় সব বিভাগের ক্লাস থাকায় একসঙ্গে একটি বা দুটি বাসে জায়গা হয় না। ফলে হেঁটে কিংবা বিকল্প বাহন ভাড়া করে যেতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে।
মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফারিয়া জেবিন বলেন, মৈত্রী হল আসলেই একটা অভিশাপ! যেখানে মাস্টার্সে এসেও একটা সিঙ্গেল সিটের জন্য এভাবে কথা বলতে হয়। যেখানে বারবার হল প্রশাসনের কাছে শুনতে হয়, বেশি সমস্যা থাকলে হল থেকে বের হয়ে যাও। থার্ড ইয়ারে উঠে সিট পেতেও বেগ পেতে হয় এই হলে। তারপর ছয়জনের একটা রুমে তারা সাত-আটজন দেওয়া শুরু করে জোর করে।
হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, হলের মেয়েদের এই দুর্দশা আর কতকাল চলবে? সিট সংকট নিরসনে স্থানান্তর বা অ্যালটমেন্ট বন্ধ করার যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাও বেশ দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এসব নিয়ে সিট কমিটির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা প্রচ- রকম দুর্ব্যবহার করে।
গত বছর আগস্ট মাসেও হলের সিট সংকট সমাধানে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। সে সময় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান সিট সংকট সমাধানের আশ্বাস দেন। এবারও আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের হলে পাঠিয়েছেন বর্তমান উপাচার্য। তবে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবেই দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. নাজমুন নাহার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে শিক্ষার্থী সরাতে গিয়ে কিছু শিক্ষার্থীকে রুমগুলোতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এটি মানছে না। শিক্ষার্থীদের কিছু দাবিদাওয়া আছে। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে বসে একটা সমাধান করব।
সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আমি নিজে হল পরিদর্শনে গিয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে ছাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। তাছাড়া আসন সংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে এই হলে অ্যালটমেন্ট বন্ধ করেছি। তাও কিছু সমস্যা রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সংকটগুলোর সমাধান করা হবে।’
