বেশিরভাগ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের দ্বিতীয় দিনেই শক্তি ফিরে পেয়েছে পুঁজিবাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ পদক্ষেপে দরপতনের ধারা কাটিয়ে গতকাল সোমবার ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে বাজার পরিস্থিতি। আগের দিনের ধারাবাহিকতায় গতকাল লেনদেনের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ৫০ পয়েন্টের বেশি পড়ে গেলেও পরবর্তী ২০ মিনিটেই হারানো সূচক পুনরুদ্ধার হয়। বাড়তি পয়েন্ট যোগ হওয়ার মাধ্যমে দিনের লেনদেন শেষ হওয়ায় আত্মবিশ্বাসী নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) বিকেলেই আরও ২৩ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর ফলে এখন মাত্র ১২ কোম্পানি ফ্লোরে আছে।
গতকালের মূল্যসূচকের পুনরুদ্ধারের দিনে লেনদেনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় ডিএসইর লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা, যা গত ছয় মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে গত বছরের ১৮ জুলাই ডিএসইতে ১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার ৩৫টি বাদে সব কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। গতকাল বাকি ৩৫টি থেকে ২৩টির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হওয়া কোম্পানিগুলো হলো বারাকা পাওয়ার, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল, বিএসআরএম স্টিল, কনফিডেন্স সিমেন্ট, ডিবিএইচ, ডরিন পাওয়ার, এনভয় টেক্সটাইল, এইচআর টেক্সটাইল, আইডিএলসি, ইনডেক্স অ্যাগ্রো, কেডিএস এক্সেসরিজ, কাট্টলি টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল পলিমার, পদ্মা অয়েল, সায়হাম কটন, শাশা ডেনিমস, সোনালি পেপার, সোনার বাংলা ইনস্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিকস, সামিট পাওয়ার ও ইউনাইটেড পাওয়ার।
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হওয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর জারি করা আদেশ মোতাবেক নিয়মিত সার্কিট ব্রেকার (আগের দিনের বাজারদরের ভিত্তিতে পৌনে ৪ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারদরের ওঠানামার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা) কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কমিশন গতকালের আদেশে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে অধিকাংশ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর প্রথম দিনের বড় দরপতন সামলে নেওয়ার পর দ্বিতীয় দিনে বাজার পরিস্থিতি ঘুরে গেছে। গতকাল লেনদেনের শুরুতে দরপতন হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই তা সামাল দিয়ে সূচকে বাড়তি পয়েন্ট যোগ হতে দেখা গেছে। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীদের তৎপরতায় বাজারে বিক্রিচাপ সামাল দেওয়া হয়েছে। এতে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বেড়েছে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দাম বেড়েছে ২০৮টির, কমেছে ১৪৪টির ও অপরিবর্তিত ছিল ৩৯টির দর। স্কয়ার ফার্মা, লাফার্জহোলসিমসহ বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ১৪ পয়েন্ট। আগের দিন এ সূচকটি হারিয়েছিল ৯৬ পয়েন্ট। সূচক বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে স্কয়ার ফার্মা, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন, ইউনিবি, ট্রাস্ট ব্যাংক, নাভানা ফার্মা, লাফার্জহোলসিম, অলিম্পিক ও আফতাব অটো।
খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের দিনের মতো গতকালও প্রকৌশল, বস্ত্র ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের শেয়ারগুলো সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে। চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে এসব খাত এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এসব খাতের অনেক কোম্পানিই নতুন করে লোকসানে পড়েছে। গতকাল সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে প্রকৌশল খাত। এ খাতের লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দর বাড়া ও কমার তালিকায় খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও খাতটির সবচেয়ে বড় বাজার মূলধনী কোম্পানি ওয়ালটনের কারণে পুরো খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। গতকাল এ খাতটি সাড়ে ৫ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। ওয়ালটনের দাম কমেছে সাড়ে ৭ শতাংশ।
দর হারানোর তালিকার পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত। এ খাতের কোম্পানিগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অনিয়ম, আত্মসাৎ ও খেলাপি সংকটে ভুগছে। গতকাল এ খাতটি ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়েছে। ডলার ও গ্যাস সংকট এবং রপ্তানির প্রধান বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আয়ও কমে গেছে। অনেক কোম্পানি পড়েছে লোকসানে। এসব কোম্পানি থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিতে চাইছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে বিক্রিচাপ বাড়ায় আগের দিনের মতো গতকালও বড় পতনের মধ্যে পড়েছে খাতটি। গতকাল এ খাতের বাজার মূলধন কমেছে প্রায় সোয়া ৪ শতাংশ। এ ছাড়া সেবা ও নির্মাণ, জ্বালানি, সিরামিক, ট্যানারি ও ব্যাংক খাতও বাজার মূলধন হারিয়েছে। বিপরীতে খাদ্য, বীমা, তথ্যপ্রযুক্তি, কাগজ ও প্রকাশনা, সিমেন্ট খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে।
