যে জীবন পত্রিকা হকারের

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:১৩ এএম

মানুষ ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাসার দরজার নিচে পত্রিকা চলে যায়। গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে যখন পত্রিকায় খবর পড়ি, তখন কি আমরা চিন্তা করি, যারা এই পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছে তাদের বিষয়ে। হ্যাঁ বলছি পত্রিকার হকারদের কথা। যারা প্রতিদিন এভাবে হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আমরা কখনো কি ভেবে দেখি তারা কেমন আছেন? কীভাবে চলছেন?

এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একজন ব্যতিক্রমী পত্রিকার হকারের দেখা মিলল রাজধানীর পান্থপথে স্কোয়ার হাসপাতালের সামনে। ওই এলাকার একটি অংশে পত্রিকা বিলি করে হাসপাতালটির সামনে রাস্তার ফুটপাতের একটি কোণে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা দিয়ে টেবিল সাজিয়ে প্রতিদিন ভোরে একটি বাক্স রেখে দিয়ে চলে যান। এরপর আর সারা বেলা সেখানে কেউ থাকেন না। চলতি পথে যাদের সংবাদপত্র কেনার প্রয়োজন তারা পত্রিকার দাম ওই বাক্সে রেখে তার কাক্সিক্ষত পত্রিকা কিনে নেন।

ব্যক্তিটির নাম সাহেদ আহম্মদ। বয়স ৩৫। গ্রামের বাড়ি যশোরের শার্শায়। বাবা-মা, স্ত্রী ও ছোট বোনকে নিয়ে বর্তমানে থাকেন মিরপুরে। এরআগে কলাবাগান ও রাজাবাজার এলাকায় ছিলেন দীর্ঘদিন। সেই থেকে সাহেদ ওই স্থানে প্রায় ১৭/১৮ বছর ধরে এভাবে ব্যবসা করছেন। তবে এই টাকায় তার সংসার চালানো অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। আর তাই এই পেশার পাশাপাশি ফুটপাতে করছেন জুতা ও রেডিমেড গার্মেন্টস পণ্য বিক্রির ব্যবসা।

মঙ্গলবার সাহেদ আহম্মদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আবেগি কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভালোবাসা থেকে এই পত্রিকার হকারিটা করে চলেছেন এখনো। হকারি করে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মতো আয় হয়। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে এই টাকায় পরিবার নিয়ে চলা খুব কষ্টকর। তাই এখন এই হকারির পাশাপাশি বড় ভাইয়ের সঙ্গে জুতা ও রেডিমেট গার্মেন্টস পণ্য বিক্রি করি।’

এ ধরনের অভাবনীয় পত্রিকার স্টল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, বাবা হকারি করেছেন, এখন করেন না। তিনি তখন স্কুলে যান। পড়ালেখার খরচ চালানোর জন্য ছোটবেলা থেকে এই হকারি শুরু করেছেন। আগে বেশ ভালো হলেও করোনা মহামারীর পর থেকে পত্রিকা রাখার হার কমেছে। কারণ করোনার পর থেকে লোকে মোবাইল ফোনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন বেশি। তবে একেবারে কমে যায়নি পত্রিকা পড়া। তিনি বলেন, প্রতিদিন ১৫০ থেকে ১৬০ বাসায় পত্রিকা বিলি করি। পরে ৫০/৬০টি পত্রিকা টেবিলে সাজিয়ে রেখে বাসায় চলে যাই। সেখানে একটি সাদা কাচের বাক্স থাকে। সেখানে পথচারীরা পত্রিকা কিনলে টাকা রেখে যান।

ক্ষতি বা চুরি হয়ে যায় কি না প্রশ্ন করলে সাহেদ বলেন, এটা সম্পূর্ণ বিশ্বাসের ওপর দিই। তবে আশপাশে লোকজন সবাই আমাকে চেনেন। তারাও খেয়াল রাখেন। তবে মাঝে মাঝে টোকাইরা টাকা নিয়ে যায় অগোচরে। কিছু লোক হয়তো টাকাও দেয় না। তবে এতে তারা আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবেন। আমার ভাগ্য তো নিতে পারবেন না। এতটুকু মেনে নিয়েছি।

তাকে সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে উল্লেখ করে সাহেদ আরও বলেন, ওই এলাকার কমিশনার ইরান আমার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সাপোর্ট দিয়েছেন। এছাড়া বেশ কিছু বড় মাপের লোকজন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তারা এখান থেকে পত্রিকা কেনেন।

নির্বাচনের দিন ভালো পত্রিকা বিক্রি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের দিন সব পত্রিকা বিক্রি হয়ে গেছে। চাইলে বেশি টাকায়ও বিক্রি করতে পারতাম। তবে সততার জায়গা থেকে সেটা করিনি। পত্রিকাগুলোকে আরও ভালো ভালো খবর পরিবেশন করতে হবে। মানুষ আসলে খবর খুঁজে। যদি ভালো ভালো খবর পরিবেশন হয় তবে পত্রিকা ভালো চলে।

মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের মতো স্টলটি জাতীয় দৈনিক দিয়ে সাজানো। পাশের একটি কাচের বাক্স। সেখানে কিছু টাকা। কথা হয় ওই স্টলটির লাগোয়া সাস্লিস ফুড বেকারি ও সুইটস দোকানের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ খবিরের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০/১২ বছর ধরে এখানে দেখছি এভাবেই চলছে স্টলটি। বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে ওই স্টলটি ছেড়ে রেখেছেন সাহেদ আহম্মদ। তিনি সকালে ওই এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে পত্রিকা বিলি করে কিছু পত্রিকা নিয়ে এখানে রেখে চলে আসেন। ওই স্টলটির পাশেরই এক চা-সিগারেট বিক্রেতা আনোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে প্রায় ১০/১২ বছর ধরে চা-সিগারেট বিক্রি করছি। তখন থেকেই দেখছি এখানে। আসলে সাহেদ আহম্মদ ভাই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এটা চালাচ্ছে।

আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে আসে সাহেদের বড় ভাই মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই এটা চালায়। আমরা এই এলাকায় ২৫/৩০ বছর ধরে এ কাজ করছি। সবাই আমাদের চেনে। এখানে এই বাক্স ও পত্রিকা থাকে। যার প্রয়োজন কিনে টাকা বাক্সে রাখে। বিশ্বাসের প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছু লোক বা টোকাইরা মাঝে মধ্যে ঝামেলা করে। টাকা নিয়ে যায়। তবে আমাদের কপাল তো নিতে পারে না। কিন্তু যারা পত্রিকা কেনেন তারা সাধারণত টাকা দিয়েই কেনেন। ভাংতি না থাকলে পাশে থেকে ভাংতি করে মানুষ পত্রিকা কিনে নেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত