রাজধানীর মহাখালীর ৫০০ শয্যার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে ' সূচনায় পড়লে ধরা ক্যানসার রোগ যায় যে সারা' স্লোগান লেখা পোস্টার। তবে পোস্টারের সূচনায় চিকিৎসার কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে এই হাসপাতালে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পান না ক্যানসার আক্রান্তরা। দেশের ৬৪ জেলা থেকে ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে এসে পদে পদে ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা।
এই হাসপাতালে ভর্তি হতে এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষায় থাকতে হয় রোগীদের। এতে করে আক্রান্ত রোগীর প্রাথমিক স্তর থেকে পুরো শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি অনেক দেরিতে গিয়ে যারা শরীরে ক্যানসারের উপস্থিতি বুঝতে পারেন তারা চিকিৎসা না পেয়েই মারা যান।
বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় সরকারী খরচে কম টাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও এই হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন না। হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও বাস্তবে শয্যার প্রয়োজন ৫-৭ গুণ বেশি।
সিলেটের শীবগঞ্জ থেকে ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন মুহিবুর রহমান। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলায় দাঁড়িয়ে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক কথা বলেন তার সঙ্গে। তিনি বলেন, সিলেট এম এ জি ওসমানি হাসপাতালে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। সেখানকার চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়েছেন জরুরি ভিত্তিতে ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি হতে। কিন্তু গত ১৫ দিন ধরে হাসপাতালে ঘুরেও তিনি ভর্তি হতে পারছেন না। যেখানেই যাচ্ছেন বলা হচ্ছে হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই।
মানিকগঞ্জ থেকে এসেছেন তানবীর জামান। তিনি জানান, ফজরের নামাজ পড়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনও আমার সামনে লম্বা লাইন ছিল। দুপুর ১২টায় আউটডোর থেকে টিকিট সংগ্রহ করে ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে শয্যা খালি নেই, কবে খালি হবে তাও জানাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
রোগীদের অভিযোগ, নানা ভোগান্তির পর ২-৩ দিন চেষ্টার পর টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসক দেখাতে পারলেও চিকিৎসার নিশ্চয়তা নেই রোগীদের। চিকিৎসকেরা প্রথমেই তাদের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা দেন যা করাতেই ৭-১০ দিন লেগে যায়। রিপোর্ট নিয়ে পুনরায় দেখাতে গেলে ক্যানসার ধরা পড়লে চিকিৎসকরা যখন ভর্তির পরামর্শ দেন তখন তারা হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি হতে পারেন না। রোগীরা পরীক্ষা নিরীক্ষা ডাক্তার ও সিটের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্যানসার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের একটি সিট পেতে হলে ১ মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখানে যারা চিকিৎসা নিতে ভর্তি হন তাদের গড়ে এক-দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হয়, ফলে শয্যা খালি হয় না। কিন্ত প্রতিদিন এই হাসপাতালে ভর্তি হতে আসেন ৫০০-৬০০ মানুষ যারা সিট পেতে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রথমে লাইনে দাঁড়িয়ে বহির্বিভাগ থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এই লাইনে দাঁড়ানোর মধ্যে দিয়েই ভোগান্তির শুরু। চাহিদার চেয়ে ধারণ ক্ষমতা কম থাকায় বহির্বিভাগ থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে রোগী কিংবা তার স্বজনরা ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়ান। সকাল ৮টা থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হয় এবং দুপুর ২টা পর্যন্ত বিক্রি চলে। টিকিট পেতে ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও লম্বা লাইন পেরিয়ে বহির্বিভাগে ডাক্তার দেখাতে পারেন না অনেকে। ফলে তারা পরদিনের অপেক্ষায় থাকেন।
যারা টিকিট পেয়ে চিকিৎসক দেখাতে সমর্থ হন তারাও শয্যা সংকটের কারণে ভর্তি হতে পারেন না। শয্যা পেতে রাতের পর রাত এসব রোগীকে হাসপাতাল ভবনের বাইরে খোলা জায়গায় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করেও শয্যা মিলে না, চিকিৎসা শুরু হয় না। যাদের ক্যানসার প্রাইমারি স্তরে ছিল তারা চলে যায় সেকেন্ডারিতে।
