বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সফলভাবে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত এক রোগীর সফল বোন ম্যারো (অস্থিমজ্জা) প্রতিস্থাপন হয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন হয়। তবে হেমাটোলজি বিভাগে নবনির্মিত বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন অ্যান্ড স্টেম সেল থেরাপি সেন্টারের এটাই প্রথম বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন। দুটি বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সালাহউদ্দীন শাহ।
আজ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করা রোগী বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন। তাকে তিন দিনের মধ্যে ছুটি দেওয়া হবে। পরে তিনি নিয়মিত ফলোআপে থাকবেন বলে জানান চিকিৎসকরা।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. মো. সালাহউদ্দীন শাহ জানান, গত ১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ-ব্লকে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্থায়ীভাবে ‘সেন্টার ফর ব্লাড, বোন ম্যারা ট্রান্সপ্লান্টেশন অ্যান্ড স্টেম সেল থেরাপি সেন্টার’ স্থাপন করা হয়। এই সেন্টারে প্রথমবারের মতো সফল বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী এনামুল হক চার মাস আগে নানান শারীরিক জটিলতা নিয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হেমাটোলোজি বিভাগের চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন এনামুল হক মাল্টিপোল মায়োলোমা বা জটিল রক্তের ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত। এরপর হেমাটোলোজি বিভাগে তার চিকিৎসা শুরু হয়। এক পর্যায়ে চিকিৎসকরা তার বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
গত ৭ ডিসেম্বর এনামুল হককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার এক পর্যায়ে তাকে অটোলোগাস বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য গত ১৭ জানুয়ারি রোগীর শরীর থেকে স্টেম সেল সংগ্রহ করা হয়। ওই দিনই রোগীকে কন্ডিশনিং থেরাপি দেওয়া হয়। পরে গত ১৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দীন শাহ্ রোগীর শরীরে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করেন। ৩০ জানুয়ারি রোগীর নিউট্রোফিল (শ্বেত রক্তকনিকা) রিকভারি হয়। বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের ১৮ দিন পরে রোগীর শরীরের কোনও ধরনের জটিলতা দেখা যায়নি। ফলে এই প্রতিস্থাপনকে ইতিবাচক ও সফল বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
সেন্টারের প্রথম বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. মো. সালাহউদ্দীন শাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্যাল্টেশন সেন্টারটা গত ৬ বছর অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। দীর্ঘদিন এটার পেছনে লেগে থেকে গত ১ জানুয়ারি এটার উদ্বোধন করা হয়। প্রতিস্থাপন উপযোগী করতে দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। একবছর ধরে নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এরপর এই রোগী ভর্তি করে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্যাল্টেশন করেছি। এই সেন্টারের জন্য এটাই প্রথম। এর আগে ২০১৮ সালে হেমাটোলজি বিভাগে আমি আরেকটি বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করেছি। পরে গত ছয় বছর ধরে বিভাগীয় প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে এখানে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করা যায়নি।
এই চিকিৎসক জানান, দ্বিতীয়বার বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের জন্য প্রথম রোগীকে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুই-চার বছর পরে যখন রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে না ও রোগী অনিয়মিত ফলোআপে থাকে, তখন দ্বিতীয়বারের মতো বোন ম্যারো ট্রান্সপ্যাল্টেশন করার প্রয়োজন হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ব্লাড, বোন ম্যারা ট্রান্সপ্লান্টেশন অ্যান্ড স্টেম সেল থেরাপি’-তে প্রথম রোগী হিসেবে এনামুল হকের বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনে খরচ হয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার টাকা। দেশের বেসরকারি হাসপাতাল ভেদে খরচ হচ্ছে ৬ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত। বিদেশের এই ধরনের বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের খরচ হয় হাসপাতালভেদে ২০ লাখ টাকা থেকে ৩০ লাখ টাকা।
এ সময় উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় দেশের রোগীদের যাতে বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে না হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকারের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সেন্টারে মাসে ৩-৫টা বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। বর্তমান যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে তাতে প্রতি মাসে একটি করে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন সম্ভব।
এনামুল হকের শরীরে যে ‘অটোলগাস’ পদ্ধতিতে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করা হয়, সেই পদ্ধতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. মো. সালাহউদ্দীন শাহ। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় রোগীর দেহে উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপি বা ক্যান্সারের ওষুধ প্রয়োগের আগেই রোগীর শরীর থেকেই নির্দিষ্ট মাত্রায় স্টেম সেল (শরীরের স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদনক্ষম কোষ) সংগ্রহ করা হয়। এরপর রোগীর শরীরে উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপি বা ক্যান্সারের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। উচ্চ মাত্রার কেমোথেরাপির মাধ্যমে শরীরের ক্যান্সার কোষগুলো গভীরভাবে নির্মূল করা হয়। তবে এতে স্বাভাবিক রক্ত উৎপাদনের কোষগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন আগেই সংগৃহীত স্টেম সেলগুলো পুনরায় শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই উৎপাদনক্ষম কোষগুলো থেকে পুনরায় স্বাভাবিক রক্তের কোষ তৈরি হয়ে থাকে।
বোন ম্যারো প্রতিস্থাপন করা রোগীকে প্রথম ১০০ দিন নিয়মিত ফলোআপে থাকার পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতা হতে পারে। এ থেকে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। তাই রোগীকে প্রথম ১০০ দিন নিয়মিত ফলো আপে রাখতে হবে এবং কেমোথেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের পরও সময়ের সাথে ক্যান্সারের পুনরায় আবির্ভাবের সম্ভাবনা থাকে।
এবার আইসিসির মাসসেরার তালিকায় শামার
নৌকা এখন মার্কেট পাচ্ছে না: নুর
নতুন করে বাড়ি-গাড়ি করতে পারবেন না ঋণ খেলাপিরা 