২০২৩ সালকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব। কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া একটি বছর হিসেবে নাকি ঘটনাবহুল কোনো বর্ষ পরিক্রমা। জাতীয় থেকে বিশ্বরাজনীতি কোনোটাই যেন কম না। বিশ্বরাজনীতির পাল্লায় পড়ে জাতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা সবকিছুতেই যেন টালমাটাল অবস্থা। আজকের পৃথিবীতে সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং একটার দ্বারা আরেকটা প্রভাবিত, কেউ যদি কোনো ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নাও থাকে। অন্যদিকে এই পৃথিবীতে বিচ্ছিন্নভাবে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আবার পৃথিবীকে যতটা মুক্ত দাবি করা করা হয় কোনোভাবেই ততটা মুক্ত না। এমনকি তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রেও না। সব তথ্য সবাইকে জানতে দেওয়া হয় না। হোক সেটা স্ব-আরোপিত কৌশলগত স্বার্থ আদায়ে বা চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।
যেহেতু প্রত্যেকটি বড় ঘটনার প্রভাব কোনো না কোনোভাবে সবার ওপর পড়ে, তাই না চাইলেও সবাই সেই ঘটনার অংশ হয়ে যায়। সেই বিবেচনায় আমরা সবাই বিশ্বরাজনীতির অংশ। আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত, সহিংসতা ও অস্থিরতা চলছে তা শুধু স্থানীয় পর্যায়ের কারণ থেকে তৈরি নয়। অনেক সময় বাইরের প্রভাবকে স্থানীয় পর্যায়ে মোকাবিলা করার সক্ষমতার অভাবের কারণেও এই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে ভূরি ভূরি। বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এর প্রধানতম কারণ। ভিন্ন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি সারা পৃথিবীতেই আছে। প্রত্যেকটা সংস্কৃতিতে ভিন্ন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ের প্রচলিত উপায়ও আছে, সেটাই হয়তো সেই সমাজের ধারাবাহিক বিকাশের ধারা। ভিন্ন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি চূড়ান্ত সংঘাতের পর্যায়ে তখনই যায় যখন এর পেছনে স্বার্থান্বেষী শক্তিগুলো পক্ষে-বিপক্ষে অজাচিত ভূমিকা পালন করে। ২০২৩ সালের পৃথিবীতে ঘটতে থাকা বা নতুন শুরু হওয়া অস্থিরতা ও সংঘাতগুলোকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা কোনো ভাবেই অসম্ভব না। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সহজ সমীকরণ মনে হলেও তাতে এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব কোনোভাবেই খাটো হয়ে যায় না।
অনেকে বলে থাকেন বাজার ও প্রযুক্তি বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার জন্য দায়ী বা প্রথমতম দুটি অনুঘটক। বাজার ও প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে বিশ্বায়নকে হরহামেশা মেলানো হলেও যা সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয় তা হচ্ছে বিশ্ব উপনিবেশবাদ। উপনিবেশবাদকে বাদ দিয়ে বিশ্বায়নের প্রভাব চর্চা করা যেন ঘোড়ার আছে গাড়ি জুড়ে দেওয়া। আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বায়নের দুটি চেহারা আছে, যার একটি বিশ্ব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি। আজ পৃথিবীর ৮০০ কোটি জনগোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখতে এর প্রয়োজন আছে বৈকি। বিশ্বায়নের (পড়ুন নব্য-উপনিবেশবাদ) অন্য চেহারাটি বর্তমান বিশ্ব ক্ষমতা-কাঠামোকে ধরে রাখতে, ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা আছেন তাদের জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে বাকি বিশ্বকে একইসঙ্গে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। প্রজা ছাড়া রাজার কীই-বা মূল্য আছে তার রাজত্বে!
এই ক্ষমতা কাঠামোকে অবজ্ঞা করে বর্তমান অবস্থায় দরিদ্র বিশ্বের জনগোষ্ঠীর জীবন-মান উন্নয়নে কেন্দ্রীভূত সম্পদ থেকে ভাগ পাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ঔপনিবেশিক শক্তির ঐতিহাসিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়া এই অধিকারের বৈধতা দেয় সব ধরনের কার্যকারণ সম্পর্ককে বিবেচনায় রেখেই। সে কারণেই পশ্চিমা ধনী দেশগুলো আজ নিজেদের সীমানা সুরক্ষায় এতটা সচেষ্ট যা আগে কখনো সেভাবে দেখা যায়নি। বিশ্বায়ন বললেও অভিবাসন বন্ধে যারপরনাই তারা রক্ষণশীল। তবে ধনী দেশগুলোর অভিবাসন বন্ধের এই চেষ্টা কোনোভাবে সফল হবে বলে মনে হয় না, তাদের প্রচেষ্টা যতটা তীব্র হবে অভিবাসন ততটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সেটাই সার।
আজকের বিশ্বে রাশিয়া ও ইউক্রেনে যা হচ্ছে তার সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের জীবনমানের গতিপ্রকৃতি সরাসরি যুক্ত। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল-লেবানন-ইয়েমেন, চীন-তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি প্রত্যেকটি ঘটনাই পৃথিবীর ক্ষমতার মানচিত্রে বাঁকবদলের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ২০২২ সালের মতো ২০২৩ সালেও পৃথিবীর মনোযোগ ছিল ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতে। আসছে ফেব্রুয়ারিতে এই সংঘাত তৃতীয় বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। যুদ্ধের মাধ্যমে অর্থনীতি গতিশীল করার যে তত্ত্ব তাও হয়তো এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। ধনী দেশগুলোর হাতে সঞ্চিত অর্থ ইতিমধ্যে শেষের দিকেই মনে হয়, তাই এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করছে। অনেকেই বলছেন ২০২৪ এর গ্রীষ্ম হতে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সর্বশেষ বছর। এই সময়ের মধ্যেই উভয়পক্ষই তাদের জন্য আপাত একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান নিয়ে আসতে বাধ্য হবে। তবে সেই সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ক্ষমতার মঞ্চে থাকার জোর নিশ্চয়তা থাকলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ইউক্রেনের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। অন্যদিকে এই সময়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্ব থেকে যতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে আরও বেশি সচেষ্ট হবে এবং বলা বাহুল্য এজন্য নতুন জোট ব্রিকসকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পশ্চিমাদের এখন আর নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই বলেই আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়, তবে নিজেদের মান রক্ষা করার একটা তাড়না তাদের মধ্যে থাকতে পারে।
তবে ২০২৪ সালে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে, গাজা থেকে শুরু হলেও এই সংঘাত ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়াচ্ছে এবং সার্বিক পরিস্থিতির কারণে তা আরও বেশি বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ইউক্রেন থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল সংঘাত বর্তমান অবস্থায় সীমিত থাকার সম্ভাবনা কম। ইরানকে কেন্দ্র করে এই সংঘাত একটা বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে বিশ্ব ক্ষমতাধরদের পক্ষ থেকে। তবে সে ক্ষেত্রেও ঝুঁকি অনেক, প্রথম ঝুঁকি এই প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত পরিসরের যেকোনো সংঘাতে ইসরায়েলের যুক্ত হওয়া তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য কতটা সহায়ক হবে তা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ আছে।
আজকের মধ্যপ্রাচ্য আর নব্বইয়ের দশকের মধ্যপ্রাচ্য এক না। ইরাক যুদ্ধ, আরব বসন্ত ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা বেড়েছে সত্যি কিন্তু ঝুঁকি বেড়েছে কয়েকগুণ। ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের জন্য সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে কয়েকগুণ যদি বর্তমান সংঘাত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যেকোনো সংঘাতে যুক্ত হওয়া রাশিয়া ও চীনকে এই সংঘাতে ডেকে নিয়ে আসবে। চীন ও রাশিয়াও সেই আহ্বান অবজ্ঞা করতে পারবে বলে মনে হয় না। যেকোনো সময়ের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব আগের তুলনায় বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রভাব কতটুকু বাড়তে দিতে চাইবে তা নিয়ে নিশ্চয়ই এখন টেবিলে অনেক কাটাছেঁড়া চলছে। বলা হচ্ছে ২০২৪ সালে বিশ্বের অনেকগুলো নির্বাচন হবে যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াও রয়েছে। বিশ্বরাজনীতির বাঁকবদল এখন অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও রাজনীতিতে যথেষ্ট মাত্রায় প্রভাবিত করে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নির্বাচিত হওয়ার জন্য হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, তখন এমনকি মার্কিন নির্বাচনেও রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল।
অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে মার্কিন নির্বাচনের আগে বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন না। এবারের নির্বাচনের আগেও যে এমনটা হবে না তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সে বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আশু সমাধান হওয়ার আপাত কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে লোহিত সাগর সুরক্ষার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নেতৃত্বে ইয়েমেনের ওপর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলা নিয়ে ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করতে পারেন কিনা তা নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্ক উঠেছে। এটাই হয়তো শেষ না, এই এক হামলা দিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের দমন করা যাবে না। হুতিরা গত এক দশকের বেশি সময় জুড়ে দেশ ও দেশের বাইরের হামলা উপেক্ষা করে টিকে আছে । ইয়েমেনের ওপর হামলাকে ইতিমধ্যে নিন্দা প্রকাশ করেছে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও সৌদি আরব। তবে এসব নিন্দা ও সতর্কতা উপেক্ষা করে ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকের ওপর এই ধরনের আক্রমণ হয়তো আরও দেখা যেতে পারে।
সব কিছু বিবেচনায় ইয়েমেন ও অন্যান্য দেশে হামলা করলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তার মিত্ররা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা রাখার চেষ্টা করবে। তারা জানে উত্তেজনা যত ছড়িয়ে পড়বে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। তবে বিশ্বায়নের নিয়মে তাদের সেই ক্ষতি মেনে নেওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে খুব একটা উপায় নেই। একইভাবে এই উত্তেজনা এড়ানোর উপায় নেই সারা পৃথিবীর মানুষের, এটাই হয়তো এই সময়ের বিশ্বায়ন, অস্থিরতার বিশ্বায়ন, সংকটের বিশ্বায়ন।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
