কোনো মানুষই পরিপূর্ণ নয়

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২০ এএম

তখন মধ্যদুপুর। আনোয়ারা সৈয়দ হক এলেন অফিসে। ধীরপায়ে, গুটিগুটি। হাসিমুখে বললেন তোমাদের এখানে এসে বেশ ভালো লাগছে। ছবি তোলা শেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ডিজিটাল রুমে। এই মনোরোগ চিকিৎসক ও সাহিত্যিক বলছেন অনবরত। ৮৪ বছর বয়সেও কী যে প্রাণবন্ত তিনি! শুরু হলো তার সঙ্গে আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র এবং সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন হেড অব ডিজিটাল আপেল মাহমুদ। 

তখনো ক্যামেরা রোলিং হয়নি। তিনি বলছেন শোন, অনেক কম্প্রোমাইজ করে আমাকে এগোতে হয়েছে। কিন্তু একটার জন্য আরেকটা নষ্ট হয়নি। এর জন্য অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু এখন তো ফ্রি। হ্যাঁ, আমি একজন লেখক হতে চেয়েছি। আমার পেশায় কিন্তু বরাবরই কমিটেড ছিলাম। কষ্ট হয়েছে অনেক, কিন্তু কোনো কম্প্রোমাইজ করিনি। আমার দুটো লাইনে কাজ করতে হয়েছে। একটা হচ্ছে আমার রোগী, আরেকটা সাহিত্য। জানো, আমার না সেই ছোটবেলা থেকেই গল্পের বই পড়তে ভালো লাগত। তখন যে বয়স কত, এখন আর মনে নেই। আমার জন্ম হয়েছে ১৯৪০ সালে যশোরের মোহনগঞ্জে। জায়গাটার নাম চুড়িপটি। তখন সম্ভবত ক্লাস ওয়ানে পড়ি। পরে আমার দাদার নামে, রাস্তার নাম হয় হাজী আব্দুল করিম রোড। এখনো ওটা আছে। জায়গাটার নাম হচ্ছে মোহনগঞ্জ। যশোরে যখন বড় হচ্ছি, চারপাশে ছিল হিন্দু অধ্যুষিত পরিবার।

তাপস রায়হানের উদ্দেশে বললেন আচ্ছা, শুরু করো।

তাপস রায়হান : আপনার এসএসসি এবং এইচএসসি তাহলে যশোরেই?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : হ্যাঁ। আমি এসএসসি পাস করি ১৯৫৭ সালে। এইচএসসি ১৯৫৯ সালে। এরপর তো ’৬০ সালে, ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হই। পাস করি ১৯৬৫ সালে। এরপর গেলাম চাকরিতে। তখন তো ৬ দফা, গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ গেল। পাকিস্তান মিলিটারিতে আমরা কয়েক বন্ধু জয়েন করেছিলাম। দেশ স্বাধীনের পর, ওটা হলো বাংলাদেশ মিলিটারি। সেখানে কয়েক বছর কাজ করলাম। এরপর সেখান থেকে রিলিজ নিয়ে ইংল্যান্ড চলে গেলাম পড়াশোনা করতে। তারপর যখন ফিরে এলাম, তখন আবার আর্মিতে ফিরে গেলাম। আমার এফআরসিপি করা ছিল। কিন্তু আমাদের হেড বললেন, এই মুহূর্তে সাইকিয়াট্রিস্ট দরকার নেই। এটা শোনার পর, আমি জয়েন করলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ওটা কিন্তু আমার সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ আমি যদি তা না করতাম, তাহলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেতাম না। আর্মিতে কাজ করলে তো ওটা হতো না। সব কিছু কিন্তু ভাগ্যের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধে যে বেঁচেছিলাম, ওটাও ভাগ্য। রোগীদের সেবা করাও বিশাল ভাগ্যের বিষয়। ভাগ্য মানুষকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। আমরা সেটা বুঝি না। এই যে এত বছর বেঁচে আছি, এটাও তো ভাগ্য। তাই না? বন্ধুবান্ধব সব কোথায় চলে গেছে...!

তাপস রায়হান : কেমন লাগে বেঁচে থাকতে?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : (হাসতে হাসতে বললেন) মাঝে মাঝে মনে হয়, বেঁচে না থাকলেই ভালো হতো। কিন্তু বেঁচে থাকাটা আমি কিন্তু উপভোগ করি। এটা কিন্তু বিশাল আনন্দের বিষয়। এই যে বেঁচে আছি, এটা কি কম কথা? অবশ্য তুমি যতদিন বেঁচে থাকবে, জ্বালা-যন্ত্রণা তো থাকবেই। মৃত্যুর আগে জীবনসংগ্রামের শেষ নেই। ওটা স্বাভাবিক।

সাহাদাত পারভেজ :  আপনার অফিসিয়ালি বয়স কত হলো?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : আমি ৮৪ বছরে পা দিলাম। ওটা নিয়ে মাথা ঘামিও না। মনে রেখো, বয়স কোনো কথা না। আসল হচ্ছে, এই যে আমি এতদিন বেঁচে ছিলাম কী কাজ করেছি? সেটাই কিন্তু সবার দেখার বিষয়।  (ঘাড় ঘুড়িয়ে আনোয়ারা সৈয়দ ব্যাকড্রপে তার ছবি দেখলেন।)।

এতক্ষণ ক্যামেরা রোলিং ছাড়াই কথা হচ্ছিল। এমন সময় সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র এলেন। চেয়ার থেকে উঠলেন হেড অব ডিজিটাল আপেল মাহমুদ। তিনি ক্যামেরার পেছনে গেলেন। বললেন ৩, ২, ১, ০  অ্যাকশন। আড্ডার ভূমিকা দিলেন, তাপস রায়হান। শুরু হলো আবার...

সাহাদাত পারভেজ : আপনার ছোটবেলা থেকেই বলেন? যা বলেছেন, তা বাদে। হাহাহা?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : আসলে তখন তো ছিল একটা অস্থির সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত ভাগ, দাঙ্গা এসবের মধ্য দিয়েই কেটেছে শৈশব-কৈশোর। আমার শৈশব তো মরা। সত্যি বলতে গেলে, কোনো শৈশবই ছিল না। আমি বরাবর দোষ দিই সেসব নেতাদের, যাদের কারণে আমাদের এই বিশাল ভারত হলো ৩ খ-।  তারা আমাদের শৈশবকে হত্যা করেছে। তারা অনেক বড় নেতা হয়েছেন বটে, কিন্তু আমাদের মানসিকতাকে বিকৃত করেছেন। মনে আছে, ছোটবেলায় পেটের মধ্যে আমি একটা ‘দা’ বেঁধে ঘুরতাম। তখন আমার বয়স ৭-৮ বছর। কাকে মারব? একজন হিন্দুকে মারব! আচ্ছা বলো তো, আমাদের মানসিকতা এমন বিকৃত হলো কেন? এর দায় কার? সেই ’৪৭, ৪৮, ৪৯ সালে একটি শিশু বড় হচ্ছে বিষাক্ত পরিবেশের মধ্য দিয়ে। বলো, সে কীভাবে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হবে? আমি বলব, তোমরা তো তার চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশে মানুষ হয়েছ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমার বাবা আমার জন্য দুধ কিনতে পারতেন না। তিনি ১ পোয়া দুধের মধ্যে ৩ পোয়া পানি মিশিয়ে মায়ের হাতে দিতেন। বলতেন, দুধ কিনে এনেছেন। এর মধ্যেই আমাদের লেখাপড়া। আমরা ১১ ভাই-বোন। সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অন্যান্য লেখকের বই পড়েছি এবং বিভিন্ন শিল্পীর গান শুনেছি। এরপরও আমি বলব আমাদের স্কুলে তখন রবীন্দ্রজয়ন্তী হতো, নজরুলজয়ন্তী হতো। অনেক ভালো ভালো বিষয় শিক্ষকদের কাছে শিখেছি। জানি না, স্কুলে এখন ওসব শেখায় কি না? তারপরও কিন্তু আমার চারপাশে কিছু ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের কাছেই শিখেছি। এভাবেই বড় হয়ে উঠেছি। না হলে, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ঝোঁকটা কোত্থেকে এলো? আমার মায়ের বাবা লেখালেখি করতেন। হয়তো সেখান থেকেই আমি লেখালেখির অভ্যাসটা পেয়েছি। আমার প্রপিতামহ ছিলেন, চিকুরি চৌহান। চৌহান থেকে চৌধুরী হয়েছি। কী করে হলো, জানি না। আমার দাদা ছিলেন, নলীন বক্স চৌধুরী। তার ভাই করিম বক্স চৌধুরী। বাবা ছিলেন, রফিক উদ্দিন চৌধুরী। আর আমি ছিলাম, আনোয়ারা বেগম চৌধুরী। পরে সৈয়দ হক দুষ্টুমি করে আমার নামের সঙ্গে তার নামটা বসিয়ে দিয়েছে। হাহাহাহাহাহহাহা। ও একদিন আমার স্কুলের খাতা দেখে বলল আনোয়ারা বেগম কোনো নাম হলো? এটা বাদ দাও। আরও মডার্ন করতে হবে। বললাম, কীভাবে মডার্ন করব? তখন কেটে দিয়ে, আনোয়ারা সৈয়দ হক করে দিল। আমি বললাম, এই নাম কোনো দিন কেউ বলতে পারবে না? ও বলল, পারবে। খুব ভালো পারবে। এটা নতুন নাম। পরে আমি ভাবলাম, একজন নারীবাদীর নামই আরেকজন পুরুষ পাল্টে দিল? হাহাহাহহাহাহা! ছেলেমেয়েরা এই নাম নিয়েই আছে। ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক আর মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক।

সাহাদাত পারভেজ : সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আপনার পরিচয়ের বিষয়টা বলা যাবে?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : সেটা মধ্য ষাটের কথা। সে তো বিভিন্ন ম্যাগাজিনে লেখালেখি করত। আমি সেসব পড়তাম। মনে আছে, ১৯৬৬ সালে আমরা একটা সাদা-কালো টিভি কিনি ৬০০ টাকা দিয়ে। কিস্তির মাধ্যমে। ওটা থাকত পড়ার টেবিলে। আর আমরা মাটিতে বসে ভাত খেতাম। আচ্ছা, ওর সঙ্গে পরিচয়ের কথা বলি। আমিও তখন লেখালেখি করি। ‘৩ পয়সার জোছনা’ নামে তিনি একটি গল্প লিখেছিলেন। ওটা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। চিঠি লিখলাম তাকে। সম্ভবত চিত্রালী পত্রিকায়। এরপর তিনি চিঠির উত্তর দিলেন। এর ৬-৭ মাস পরে একদিন আমাদের দেখা হলো। তখন তো আমিও টুকটাক লিখতাম। দাদা ভাইয়ের কচিকাঁচার আসরে নিয়মিত লিখতাম। তিনি জানলেন আমাকে। আর আমিও...!

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : হক ভাই কি জানতেন, আপনিও লেখালেখি করেন?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : আরে না! উনি কোত্থেকে জানবেন? আমিই বলেছি।  উনি তো ছিলেন ঢাকার মানুষ। শোনো না, আমাদের মেডিকেল কলেজের একটা গর্ব ছিল এই কলেজের কোনো মেয়েকে কেউ ভাগাতে পারবে না। আমাদের কলেজের ছেলেমেয়েরা এটা জানার পর তো, সিদ্ধান্ত নিল ওকে মারবে। সবাই মিলে মারলে তো ও নাই হয়ে যেত! হাহাহাহাহা। কিন্তু সেটা যে কোনোভাবেই হোক এড়ানো গেছে। সাধারণত আমাদের দেখা হতো বাইরে। এরপর তো বাবা-মায়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব গেল। বাবা প্রথমে রাজি হননি। মা রাজি ছিলেন। পরে বাবাও সম্মত হলেন। এর জন্য মা অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছিলেন। এরপর তো বাবা বলতেন, আমার জামাইদের মধ্যে বেস্ট জামাই হচ্ছে সৈয়দ হক।  তিনি ৪ জামাই দেখে গেছেন। দুজনকে দেখেননি। তারপর মারা গেলেন।

তাপস রায়হান : আপনার লেখালেখির বিষয়ে একটু আসি? আপনি যখন লেখেন, তখন কি আগেই সিদ্ধান্ত নেন, কী লিখবেন? নাকি কলম আপনাকে পরিণতির দিকে নিয়ে যায়?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : যে কোনো লেখার আগে, মনে একটা থিম থাকে। তবে কখনো কখনো কলম তোমাকে টেনে নিয়ে যাবে। আবার কখনো লেখক কলমকে টেনে নিয়ে যায়। তবে তোমার ডিরেকশন যদি ঠিক থাকে, আমি ওখানে হিট করব ওখানেই হয়তো তুমি যাবে। তবে যেভাবে যেতে  চেয়েছিলে, ঠিক সেভাবে নাও হতে পারে। একটু অন্যভাবে গেলে। এ রকমই হয়। সবসময় নিজের থিম অনুযায়ী, কাহিনি গড়ে ওঠে না। লেখার একটা গতি থাকে। ওটাকে আমার থিমের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হয়। আবার আমার থিম এবং লেখার গতি যদি কন্ট্রাস্ট হয়ে যায়, তাহলে আবার আমাকে ফিরে আসতে হয়। কারণ আমার তো একটা টার্গেট আছে।

তাপস রায়হান : আপনার অনেক লেখায় মনস্তত্ত্ব বিষয়টা গুরুত্ব পেয়েছে। এটা কি পেশার কারণে?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : দেখো, আমি তো এ বিষয়ে একজন ডাক্তার। বিভিন্ন মানসিক হাসপাতালে দিন-রাত কাজ করেছি। এটা হতেই পারে। তবে সচেতনভাবে মানসিক রোগকে আমি সাহিত্যে টেনে আনি না। মনে রেখো, কোনো মানুষই কিন্তু নরমাল নয়। কেউ পরিপূর্ণ নয়। মানুষ মাত্রই একটু এবনরমালিটি থাকবে। আর এবনরমালিটি না থাকলে, কখনো তোমাদের অফিসে আমি আসতাম না। বাসায় বসে টেলিভিশন দেখতাম আর পান খেতাম। আমি কিন্তু এখানে এসেছি। এর মানে কী? মানুষের বয়সের বিপরীতে একটা ফোর্স কাজ করে। পরিপূর্ণ কিন্তু কেবানো মানুষই নয়। তাহলে তো মৃত্যুর আগে মনে হতো যাক, জীবনের সব কাজ করেছি। এবার চলে যাচ্ছি। কোনো আফসোস নেই। আমি তৃপ্ত, আমি চলে যাচ্ছি এ রকম মানুষ কোথাও পাবে? তাই তো বলি কোনো মানুষই পরিপূর্ণ নয়, তৃপ্ত নয়। জীবনে পরিপূর্ণতা খুঁজে নিতে হয়। বিদ্যাসাগরই কি পরিপূর্ণ ছিলেন? তিনি তো সারাজীবন যে কমিউনিটিতে বাস করেছিলেন, যে পরিবেশে বড় হয়েছিলেন তিনিই তো শেষ বয়সে সেই সমাজ ত্যাগ করেন, ঘৃণা করে চলে গেলেন একেবারে উপজাতিদের মধ্যে। সেই শিক্ষাবর্জিত, সভ্যতাবর্জিত সাঁওতালদের কাছে। ওখানেই মারা গেলেন। বিদ্যাসাগর কি কম কষ্ট পেয়েছিলেন? তিনিই কি পরিপূর্ণতা নিয়ে মরতে পেরেছিলেন? তিনি ছিলেন অসম্ভব অতৃপ্ত মানুষ। অথচ দেখো, সারাজীবন তিনি মানুষের সেবা করে গেছেন। আমার কি মনে হয় জানো? সবার ঘরে বঙ্গবন্ধু, বেগম রোকেয়া আর বিদ্যাসাগরের ছবি টানিয়ে রাখা উচিত। তুমি একটিবার চিন্তা করো, কীভাবে তারা আমাদের এতদূর নিয়ে এসেছেন? আমরা কিন্তু এখনো বিদ্যাসাগরকে মূল্যায়ন করতে পারিনি। আমি মনে করি, তিনি ভারতবর্ষের নারী জাতিকে বাঁচিয়েছেন। শোনো রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া আর বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে না এলে কোথায় থাকতাম আমরা?

তাপস রায়হান : সৈয়দ শামসুল হক প্রায়ই বলতেন, আমার যুদ্ধ বর্তমানের সঙ্গে নয়। মহাকালের সঙ্গে। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : শোনো, ওর বিরুদ্ধে অনেক কবি-সাহিত্যিক বাজে কথা বলেছে। কিন্তু হক পাত্তাই দিত না। মাঝেমধ্যে আমি রাগ করতাম। বলতাম, তুমি এসবের প্রতিবাদ করো না কেন? তখন ও বলত মঞ্জু, এসব নিয়ে চিন্তা করো না। মঞ্জু আমার ডাক নাম। কেউ, তাকে নিয়ে কিছু করছে? না, করেনি। তার মতো নির্মোহ মানুষ আমি কম দেখেছি। ওর মৃত্যুর ৩ মাস পর, আমি সাহস করে হকের স্টাডি রুম খুললাম। দেখলাম, ঘরের মধ্যে তেলাপোকা-চামচিকা-ইঁদুর মরে পড়ে আছে। আর ফ্লোরে একটা কাগজ। তুলে দেখি, ওটা একটা ফর্ম। লেখা সেখানে ‘সেলফ অ্যাসেসমেন্ট ফর গেটিং নোবেল প্রাইজ’। হি ডিড নট কেয়োর। আমি আজও জানি না, সেই ফর্ম সে কোত্থেকে পেল? তিনি আমাকেও সেটা বলেননি। যদি বলতেন, জোর করে হলেও সেটা ফিলাপ করাতাম। যারা নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন, সবাইকেই এটা ফিলাপ করতে হয়। তিনি এসব পছন্দ করতেন না। আমি বাংলা একাডেমি এবং একুশে যখন পেয়েছি, তখন কিন্তু অনেকেই বলেছে এটা নাকি লবিং করে পেয়েছি! আসলে কিছু কথা গায়ে মাখাতে নেই। ঝেড়ে ফেলতে হয়।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আমাদের এখানে নারীদের সাহিত্যচর্চার পরিবেশ কেমন? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?

আনোয়ারা সৈয়দ হক : শোনো, প্রত্যেকটা মেয়েকে চিন্তা করতে হবে আমাকে লেখক হতে হলে, সমাজ-সংসারের অনেক কিছুকেই উপেক্ষা করতে হবে। কে, কী বলল ওসবে কোনো পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। আমাকে একরোখা হতে হবে।

এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনি মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। ’৭১-এর আগে ও পরে আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেছেন। সেই আগুনঝরা দিনের কিছু স্মৃতিচারণ করুন। তরুণ প্রজন্ম যেন জানতে পারে- কীভাবে, কীসের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম? 

আনোয়ারা সৈয়দ হক : শোনো, আমাদের দেশের বয়স ৫২ হতে পারে। কিন্তু আজকের পর্যায়ে আসতে কিন্তু ৫ হাজার বছর লেগেছে। কেন জানো? সেই তখন থেকেই আমরা নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত এবং বঞ্চিত। আমাদের কারা না শাসন-শোষণ করেছে? কবে বাঙালি ভালো ছিল? সবাই রক্ত চুষে খেয়েছে। মনে রেখো, মুক্তির জন্য আমাদের মনের ভেতরে একটা আকুলতা-ব্যাকুলতা ছিল। একটা বিশাল ক্রোধ জমা হচ্ছিল। সেটাকে বঙ্গবন্ধু এসে, ‘ টুং’ করে বাজিয়ে দিলেন। যার যা আছে, তাই নিয়ে আমরা যুদ্ধে গেলাম। কী ছিল আমাদের? কিন্তু গিয়েছিলাম তো। জয়ীও হয়েছি। আমাদের সাইকিক প্যাটার্নের মধ্যেই স্বাধীনতার জন্য আকুল ছিলাম। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এখন দেশের লোকই চুষে খাচ্ছে। কই, কিছু করতে পারছি?

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত