ডলারে সংকট ডলারেই মুনাফা

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:৩৪ এএম

দুই বছর ধরে বিদেশি মুদ্রা বিশেষ করে ডলারের সরবরাহজনিত ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব খাতই সংকটে রয়েছে। ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনমুখী খাতের অনেক কোম্পানি লোকসানে পড়েছে কিংবা মুনাফা ব্যাপক হারে সংকুচিত হয়েছে। তবে সংকটকালে ডলারের ব্যবসা করেই ব্যাংকগুলো ভালো ব্যবসা করছে। ২০২২-২৩ হিসাববছরে ডলার ব্যবসায় সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও ডলারের মূল্য যাতে না বাড়ে সেজন্য সবরকম চেষ্টাই করেছে এ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

২০২২-২৩ হিসাববছরে বাংলাদেশ ব্যাংক মুনাফা করেছে ৪৭ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা, যা আগের হিসাববছরের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি। সর্বশেষ হিসাববছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে মুনাফা হয়েছে, তার প্রায় ৮৯ শতাংশ এসেছে ডলার সংক্রান্ত লেনদেন থেকে। ওই সময়ে শুধু ডলার নয়, সরকারকে ধার দিয়ে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবসায়ও ব্যাপক মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২-২৩ হিসাববছরের যে বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা পর্যালোচনায় এসব তথ্য মিলেছে।

এদিকে ডলারের উচ্চমূল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিপুল মুনাফা পাইয়ে দিলেও মুদ্রাটির সংকটের কারণে দেশের বেসরকারি খাত বিপদে রয়েছে। ডলারের সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদনমুখী অধিকাংশ কোম্পানির মুনাফা কমে গেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোম্পানি পড়েছে লোকসানে। যে সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করেছে ঠিক সে সময় অর্থাৎ ২০২২-২৩ হিসাববছরে দেশীয় ইলেকট্রনিক জায়ান্ট ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে ৪৬৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বিনিময় হারের কারণে ২০২২-২৩ হিসাববছরে কোম্পানির নিট মুনাফা প্রায় ৩৬ শতাংশ কমে যায়। আগের হিসাববছরেও কোম্পানিটি এ খাতে ৩০৪ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। একই হিসাববছরে বিনিময় হারে ওষুধ খাতের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের লোকসান হয় ২৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, আগের বছরে এ খাতে লোকসান আরও বেশি ছিল কোম্পানিটির। বিনিময় হারে চলতি হিসাববছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত প্রায় ২৯ কোটি টাকা লোকসান করেছে বার্জার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এ খাতে কোনো লোকসান ছিল না কোম্পানিটির।

উৎপাদনমুখী কোম্পানিগুলো ডলারের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও সংকটের এ সময়টা ভালোভাবে উপভোগ করছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খুলতে বড় ব্যবসায়ীরাও এখন ব্যাংকগুলোতে ধরনা দিচ্ছেন। সুযোগ পেয়ে ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছে ডলার। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে শুধু বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের লেনদেন থেকে সিটি ব্যাংক ৩১৬ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা করে, যা আগের বছরে ছিল ১৩১ কোটি টাকা। বিদায়ী ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত এ খাতের মুনাফা সামান্য কমলেও টাকার অঙ্কে তা এখনো স্বাস্থ্যকর। শুধু সিটি ব্যাংকই নয়, ২০২২ সালে দেশের প্রায় সব ব্যাংকই বিদেশি মুদ্রা লেনদেন থেকে ব্যাপক মুনাফা করেছিল।

তবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারে ব্যাপক মুনাফা করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২২-২৩ হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোকে ডলার ধার, স্বল্পমেয়াদি আমানত, বিদেশি বন্ড ও ইউএস ট্রেজারি নোটস, বিল ইত্যাদি থেকে সুদ আয় হয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকগুলোকে ডলার ধার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। বাণিজ্যিক ব্যাংকে ডলার স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসেবে রেখে আয় হয় ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। আর বিদেশি বন্ড ও ইউএস ট্রেজারি নোটসে বিনিয়োগ করে আয় পেয়েছে ১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা।

তবে সর্বশেষ হিসাববছরে সবচেয়ে বেশি আয় হয়েছে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ থেকে। এ সময় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহার করে ৩৬ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে ১৭ হাজার ৫২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। আর রিজার্ভে যে অবশিষ্ট বিদেশি মুদ্রা ছিল, তা পুনর্মূল্যায়নে ১৯ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা মুনাফা হয়, যদিও তা কাগজে কলমে রয়ে গেছে। ২০২১-২২ হিসাববছরের চেয়ে ২০২২-২৩ রিজার্ভ ব্যবহার করে মুনাফা বেড়েছে ৩৮ শতাংশ বা ১০ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ হিসাববছরে ডলারের মূল্য ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১০৮ টাকা ৮৪ পয়সায় উন্নীত হয়। এ সময়ে ডলারের মূল্য বাড়ে ১৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

২০২২-২৩ হিসাববছরে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিদেশি মুদ্রায় আমানত রাখা গ্রাহকদের সুদ বাবদ ৯৫৬ কোটি টাকার সমপরিমাণের ডলার ব্যয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আইএমএফের পুরনো ঋণের সুদ বাবদ ৫ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে ইসিএফ সুবিধায় নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে আইএমএফের এখনো ১১ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের মোট দায় ছিল ১০০ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ইউএস ট্রেজারি নোটসে বিনিয়োগ ও বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ডে ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকা লোকসান বহন করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২২-২৩ হিসাববছরে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে বিপুল পরিমাণের ঋণ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সময়ে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোগান দিয়েছিল ৯৭ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। বিভিন্ন বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে দেওয়া বিপুল পরিমাণের এ ঋণ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ৭ হাজার ৪৭ কোটি টাকা, যা আগের হিসাববছরের চেয়ে ২৫৮ শতাংশ বেশি।

সর্বশেষ হিসাববছরে ডলার ও স্থানীয় মুদ্রা টাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ আয় হয় ১৫ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ মুনাফা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারে লাভ করেছে। এটি পার্ট অব দ্য স্টোরি। কিন্তু বাংলাদেশে ডলারের সংকট এবং ক্রমান্বয়ে যে অবনমন হচ্ছে, তা একটা জায়গায় স্থির করে রাখা হচ্ছে, এটি আরেকটি স্টোরি। বাংলাদেশ ব্যাংক তার নিজস্ব ডলার বিক্রি করেছে, অবনমনের কারণে বেশি টাকায় বিক্রি করতে পারছে। কিন্তু বড় বিষয় হলো, বিদেশি মুদ্রা খাতকে আমরা কতটুকু স্বস্তির মধ্যে আনতে পেরেছি। সেটি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় কতটুকু অবদান রাখছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় কতটুকু অবদান রাখতে পারছে, সেটি এখানে বিবেচ্য বিষয়।’

বিদেশি মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ঠিক পথেই যাচ্ছে বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তারা যে ক্রমান্বয়ে অবনমন করা, একটা ভারসাম্যে পৌঁছানো, একটা করিডরের মধ্যে রাখার যে নীতি তারা গ্রহণ করেছে, আমার মতে সেটি ঠিকই আছে। এখন সেটিকে আরও দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে। যখন ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করে, মানুষ মনে করে আরও বেশি অবনমন হবে। তখন রপ্তানিকারকরাও টাকা প্রত্যাবাসনে দেরি করে, অন্যদিকে হুন্ডি কারবারি টাকাটা অবৈধ উপায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এখন এখানে শক থেরাপির দরকার আছে। তাদের এ ধাপ আরও রেডিক্যাল করার সুযোগ আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেসরকারি খাতকে ইতিমধ্যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এখানে তাদের বিভিন্ন ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এখন তারা একটা বিনিময় হারের দিকে যাচ্ছে। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেট ছিল ১১০, তাদের কিনতে হচ্ছিল ১২০ টাকা দিয়ে। এখন একীভূত রেটের মধ্যে যাওয়ার প্রচেষ্টা ঠিকই আছে। এখন সেটিকে কতটুকু বল প্রয়োগ করতে পারবে সেটি নির্ভর করবে রিজার্ভ কতটুকু আছে। প্রয়োজনমতো বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে ইন্টারভেন করতে পারবে কি না, সেটির ওপর নির্ভর করছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত