দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) দুটি মেরামত কারখানায় আলোর রোশনাই। একসময় ভুতুড়ে পরিবেশ থাকলেও এখন দিনে-রাতে ব্যস্ত সময় পার করেন ঢাকার তেজগাঁও ও গাজীপুরের প্রধান মেরামত কারখানার শ্রমিকরা। করপোরেশনের চালিকা শক্তি হিসেবে বাস ও ট্রাকগুলোকে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সচল রাখছে এ কারখানাগুলো।
বর্তমান চেয়ারমানের যোগদানের আগে কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় বাস ও ট্রাকের জটিল ও ভারী মেরামতের কাজ করা হতো না। এখন কারখানাগুলোতে ভারী মেরামতের কাজ হয়ে থাকে। ভারী মেরামতের পাশাপাশি প্রতিটি বাসকে ডেন্টিং ও পেইন্টিং করে দৃষ্টিনন্দন করার কাজও হয়। ভারী মেরামত এবং ডেন্টিং ও পেইন্টিংয়ের জন্য দরকার দক্ষ কারিগর। এই জনবল সংকট দূর করার জন্য স্বচ্ছ নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দক্ষ কারিগর নিয়োগ দেওয়া হয়।
পুরনো ও অদক্ষ জনবলকে দক্ষ করার জন্য সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় বিভিন্ন ব্যাচে প্রায় ২৭০ জনকে ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক সিস্টেম, ডেন্টিং, পেইন্টিং বিষয়ে ও এসি সিস্টেমে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগরে পরিণত করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় প্রথমবারের মতো বিভিন্ন ডিপোর মোট ৩০ জন কারিগরকে বডি ডেন্টিং, পেইন্টিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গাজীপুরে সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানাটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে ২৬ জুন আবার চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত মেরামত কারখানার মাধ্যমে করপোরেশনে নিয়োজিত গাড়িগুলোকে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে, গাড়িবহরে যুক্ত রেখে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। গাড়ি মেরামত করে বিআরটিসির বহরে যুক্ত করে রাজস্ব বাড়ানো হয়েছে।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী নারী ফুটবল দলকে সংবর্ধনার লক্ষ্যে স্বল্পতম সময়ে (২৪ ঘণ্টা) ছাদখোলা বাস প্রস্তুত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’ বাসটি উদ্বোধন করেছেন। এ বাসটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের গাজীপুরের সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ওয়ার্কশপগুলোতে অর্ধশতাধিক গাড়ির মেরামতের কাজ হয়।
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মো. ফারুক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ের গাড়ির কাজ তেজগাঁও মেরামত কারখানায় হয়। বাইরে মেরামত করলে নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। এখানের মানসম্মত কাজের জন্য গাড়ির অনেক বড় সমস্যা দ্রুত সমাধান হয়ে যায়।’
আজিম হাওলাদার নামের মেরামত কারখানার এক শ্রমিক বলেন, ‘এই মেরামত কারখানায় আগে কোনো কাজ ছিল না। ১২ বছর বয়স থেকে আমি এই কারখানার সঙ্গে যুক্ত। কয়েক বছর আগেও বিআরটিসির থেকে বাইরের কাজ বেশি করা হতো। এখন এত কাজ বেড়েছে যে আমাদের অন্য জায়গায় গিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই।’
বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার ইউনিটপ্রধান মো. শাহীন আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষের কাছে আমাদের মেরামত কারখানার আস্থা বেড়েছে। এখানকার কারিগরদের আমাদের নিজস্ব প্রশিক্ষণব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ করেছি। তাদের দিয়ে মেরামতের সব কাজ করানো হয়। সরকারি প্রায় সব দপ্তরের গাড়ির কাজ আমরা করে থাকি।’
বিআরটিসির সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার জেনারেল ম্যানেজার ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মেরামত কারখানাটিতে মাসের পর মাস, ক্ষেত্রবিশেষে বছরও পার হয়ে যেত, বেতন-ভাতা বকেয়া ছিল। চারদিকে হাহাকার, আর জীর্র্ণ প্রতিষ্ঠান। আরও অনেক সমস্যা ছিল। এখন প্রধান কার্যালয়সহ ডিপো ইউনিটের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা নিজস্ব আয় থেকে প্রতি মাসের প্রথম দিনে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগের থেকে কাজের গতি অনেক বেড়েছে। এর সুফল হিসেবে এই কারখানায় অচল গাড়িও সচল হয়ে যাচ্ছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিআরটিসির যে মেরামত কারখানাগুলো আছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানের কারখানা। এখানে গাড়ির যাবতীয় মেরামতের কাজ করা হয়। কারখানাগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠার বড় কারণ এখানকার দক্ষ কারিগররা। উন্নত মানের মেশিন দিয়ে কাজ করায় গাড়ির বড় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান হয়ে যায়।’
