চট্টগ্রামের রাজনীতিতে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত ছিলেন। রাজনীতিতে দুই প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ভিন্নধারায় বিভক্ত হলেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে তারা একই ধারায় যুক্ত হয়েছেন। শুধু যুক্তই নন, একজনের পূর্ণতা আসছে আরেকজনের হাত ধরে।
নগরীর মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত চালু হওয়া ফ্লাইওভারের নাম রাখা হয় আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর নামে। ২০১৭ সালের জুনে চালু হলেও জিইসি মোড়ে পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে এসে নামা ও পতেঙ্গা প্রান্তের দিকে যেতে ওঠার জন্য দুটি র্যাম্প নির্মাণ করা হয়নি। যেহেতু বিমানবন্দর পর্যন্ত ফ্লাইওভার প্রকল্পটি তখনো পাস হয়নি, তাই লালখান বাজারে নামিয়ে দেওয়ায় এই র্যাম্প নির্মাণের টাকা মন্ত্রণালয়ে ফেরত গিয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০১৭ সালের ১১ জুন লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর বাজেট বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় ১৪টি র্যাম্প (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠা ও নামার রাস্তা) ছিল। সেই ১৪টির সঙ্গে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারেও একটি র্যাম্প। আর এ র্যাম্পটির মাধ্যমেই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে ফ্লাইওভার যুক্ত হবে।
গত ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামকরণ করেন ‘মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ে’। এখন এই প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের র্যাম্পটি নির্মিত হচ্ছে। এতে নগরবাসী সহজেই জিইসি মোড় থেকে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারে উঠে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে পতেঙ্গা চলে যেতে পারবে। আর এভাবেই রাজনীতির মাঠের দুটি ভিন্নধারার নেতা একই ধারায় যুক্ত হচ্ছেন।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক ও শেষ হওয়া আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জিইসি মোড় থেকে পতেঙ্গার দিকে যেতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যাত্রীরা উঠতে পারে সেজন্য পেনিনসুলা হোটেলের সামনে থেকে একটি র্যাম্প নির্মাণ করছি। এটি দামপাড়া মহিলা সমিতি বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে এসে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত হবে।’
তিনি বলেন, ‘দামপাড়ায় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ওই র্যাম্পের সঙ্গে পাশাপাশি যুক্ত হবে। ওয়াসা মোড় থেকে এসে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে যাত্রীরা সহজে পতেঙ্গার দিকে চলে যেতে পারবে।’
এই র্যাম্প নির্মিত হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আনবে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘মুরাদপুর মোড়ের পর থেকে আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ও বর্তমানে লালখান বাজার থেকে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। নকশা অনুযায়ী উঠতে হলে টাইগারপাস থেকে উঠতে হবে। তাই জিইসি থেকে যে র্যাম্পটি নির্মিত হচ্ছে তা খুব কার্যকর হবে।’
চট্টগ্রাম মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যিনি সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি হলেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের প্রকৌশলী সুভাস বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘র্যাম্প নির্মাণ কখনো সুফল বয়ে আনবে না, এতে ট্রাফিক এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর হবে। ঢাকায় আমরা দেখতে পাচ্ছি যেখানে র্যাম্প নামছে সেখানে জটলা তৈরি হচ্ছে। তাই আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’
যেসব স্থানে র্যাম্প নির্মিত হচ্ছে : এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আওতায় ১৫টি র্যাম্প নির্মিত হচ্ছে। এর মধ্যে একটি জিইসি মোড়ে। বাকি ১৪টি হলো নগরীর লালখান বাজার ম্যাজিস্ট্রেট কলোনির সামনে পতেঙ্গা থেকে এসে একটি র্যাম্প নামবে। টাইগারপাস মোড়ে নিউমার্কেট থেকে পতেঙ্গামুখী একটি র্যাম্প পলোগ্রাউন্ডের পাশ দিয়ে এসে এলিভেটেডে যুক্ত হবে এবং অন্য র্যাম্পটি পতেঙ্গা থেকে এসে আমবাগান রোডের দিকে নামবে। নগরীর আগ্রাবাদ মোড়ে চারটি র্যাম্প হচ্ছে। টাইগারপাস থেকে পতেঙ্গার দিকে যেতে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে জাদুঘরের সামনে একটি নামবে এবং আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে থেকে উঠে জনতা ব্যাংক ও এবি ব্যাংক ভবনের মাঝ দিয়ে পতেঙ্গামুখী এলিভেটেডের সঙ্গে যুক্ত হবে। আবার পতেঙ্গা থেকে আসার পথে আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়ে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের বেপারিপাড়া মোড়ের আগে নামবে এবং একই স্থান থেকে আরেকটি র্যাম্প উঠে টাইগারপাসের দিকে এলিভেটেডের সঙ্গে যুক্ত হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ফকিরহাট ২ ও ৩ নম্বর জেটির মধ্যবর্তী জায়গায় আগ্রাবাদ থেকে পতেঙ্গা যাওয়ার পথে নামার জন্য র্যাম্প থাকবে। নিমতলা বিশ্বরোড মোড়ে পোর্ট কানেকটিং রোডের দিকে পতেঙ্গা থেকে আসতে একটি র্যাম্প নামবে এবং একই স্থান থেকে একটি উঠে আগ্রাবাদের দিকে আসা এলিভেটেডের সঙ্গে যুক্ত হবে। ইপিজেড মোড়ের আগে কাঁচাবাজারের সামনে আগ্রাবাদ থেকে পতেঙ্গার দিকে যাওয়ার পথে একটি র্যাম্প নামবে এবং ইপিজেডের ভেতর থেকে একটি র্যাম্প আগ্রাবাদের দিকে আসা এলিভেটেডের সঙ্গে যুক্ত হবে। পতেঙ্গা বোট ক্লাবের দিকে যেতে সিমেন্ট ক্রসিং এলাকায় আগ্রাবাদ থেকে পতেঙ্গা যাওয়ার পথে নামার জন্য র্যাম্প হচ্ছে একটি। এর একটু পরে নারিকেলতলা এলাকায় একটি র্যাম্প থাকবে, যা দিয়ে আগ্রাবাদমুখী এলিভেটেডে ওঠা যায়। আগ্রাবাদ থেকে যাওয়ার পথে পতেঙ্গার দিকে যেতে ইস্টার্ন কেব্লসের সামনে একটি র্যাম্প নামবে। এ ছাড়া প্রধান এলিভেটেড চলে যাবে কাটগড় হয়ে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত।
গত ১৪ নভেম্বর এই এলিভেটেডের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখনো এর নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মার্চের শেষদিকে এলিভেটেডের প্রধান অংশটি চালু করা যাবে। তবে র্যাম্পগুলো শেষ করতে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে।’
