বিশ্বখ্যাত পরিচালকের ক্লাস থেকে...

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩০ এএম

২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে ঢাকা ঘুরে গেছেন ইরানি সিনেমার প্রখ্যাত নির্মাতা মাজিদ মাজিদি। গত ২৭ জানুয়ারি তিনি উৎসবের পার্শ আয়োজন মাস্টারক্লাস পর্বে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন। সাক্ষাৎকারধর্মী আলোচনায় চলচ্চিত্র কৌশল, নির্মাণশৈলীর আলোচনার পাশাপাশি পারস্য সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ যেন নিংড়ে পড়ছিল।

ক্লাসের একদম শেষপর্যায়ে দর্শকসারি থেকে একটি প্রশ্ন ধেয়ে আসে যার সার কথা হলো ইরানে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহির গ্রেপ্তার এবং শিয়া মতাবলম্বী রক্ষণশীল শাসন নিয়ে তার অবস্থান কী? দোভাষীর মাধ্যমে উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি এখানে আমার কাজ ও সিনেমা নিয়ে কথা বলতে চাই। অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।’

তবে কি তিনি ইরানের রক্ষণশীল শাসনব্যবস্থার সমর্থক? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেতে হবে ক্লাসের পুরো সময়ের আলোচনায়। মাজিদ মাজিদি বললেন আধ্যাত্মিকতার কথা আর পারস্য সাহিত্যের উজ্জ্বল সব দার্শনিক-কবির কথা। জালালুদ্দিন রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়াম থেকে শেখ সাদি পারস্যে (বর্তমান ইরান) সুর, কবিতা আর ছন্দে মারফতি বয়ানের মরমি অন্তসুর বেঁধেছিলেন; মাজিদি বলছেন, ক্যামেরার ফ্রেমে এবং গল্পের প্লটে তিনি সেই সুফিবাদী প্রেমই রূপায়ণ করেন। কারণ এখানে তিনি খুঁজে পান সেই পথ, যা ইসলামের আচরণবাদী এবাদত কর্মের ঊর্ধ্বে খোদার সঙ্গে বিলীন হতে তাসাউফ তথা আত্মশুদ্ধির সন্ধান দেয়।

ইরানি নবতরঙ্গ সিনে আন্দোলনের পটভূমিতে গড়ে ওঠা আধুনিক ইরানি চলচ্চিত্রের সমালোচকরা বলেন, মাজিদ মাজিদির মতো ইরানি নির্মাতারা রাষ্ট্রের রক্ষণশীল বিধিনিষেধের কারণে অন্য উপায়ে গল্প বলতে বাধ্য হন। মোটকথা হলো, এই যে ইরানি নির্মাতারা বাধ্য হয়ে আধ্যাত্মিকতা আর পোয়েটিক ফর্ম ব্যবহার করেন টিকে থাকার প্রয়োজনে, যা দুরন্ত আর জীবন্ত হয় সেলুলয়েড। অর্থাৎ ব্যাপারটিকে ঘটনাক্রম বলতে চান তারা।

রেজা শাহ পাহলোভির বিরুদ্ধে জনরোষ, পরে পাহলোভি রাজবংশ উৎখাতের মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালে রক্ষণশীল বিপ্লব এবং এরও পরে শিয়া মতাবলম্বী কর্তৃত্ববাদী শাসন এসব ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী ইরানি নবতরঙ্গ সিনে আন্দোলনের নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি উপরোক্ত সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘ইরানে কবিতার ব্যবহার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কবি বা কবিপ্রেমীদের মধ্যেও নয়; বরং তা প্রথাগত শিক্ষা না পাওয়া অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের মধ্যেও দেখা যায়। মানুষ নিজের মতপ্রকাশ করতে কবিতার চরণ আবৃত্তি করে। ইরানে কবিতা বৃষ্টির মতো ঝড়ে। আপনার দাদি কবিতায় তার অনুযোগ জানায়, আবার দাদার প্রতি ভালোবাসাও প্রকাশ করে কবিতায়।’

চিলড্রেন অব হ্যাভেন, মেসেঞ্জার অব গড, কালার অব প্যারাডাইজ, সং অব স্প্যারোসের পরিচালক মাজিদ মাজিদির আড়াই ঘণ্টার সেশনে থেকে কথাটাকে একদম বেলাগাম মনে হয়নি। সত্যিকার অর্থে, কিয়ারোস্তামি, মোহসিন মাখবালবেফ থেকে আসগর ফরহাদির সিনেমায় আধ্যাত্মিকতার মিশেলে পোয়েটিক ধাঁচের সংশ্লেষ অনন্য ও অনবদ্য। পোয়েটিক ফর্ম আর আধ্যাত্মিকতার মিশেলে যারা ক্যামেরাকে কবিতার কলমের মতো ব্যবহার করছেন তাদের অন্যতম পুরোধা মাজিদ মাজিদি। হাফিজ, রুমি, ওমর খৈয়াম, শেখ সাদির কর্ম, কবিতা, দর্শন তাকে কতটা আন্দোলিত করে তা নিয়েই যেন ছিল তার সব কথা। পারস্যে সুফিবাদী বয়ান যেমন খোদাপ্রাপ্তির জন্য ভালোবাসার দুয়ার খুলেছিল, মাজিদ মাজিদি সেই ধারার মুরিদ। জানালেন, তিনি অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন সাধারণ মানুষের থেকে। তার সঞ্চিত অভিজ্ঞতাই তার সিনেমার গল্প। ফিকশনের ছত্রে ছত্রে ডকুমেন্টারির আবহ মিশিয়েই গল্প বলেন তিনি।

বিদেশি ভাষার সিনেমা বিভাগে অস্কার মনোনীত ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’ নিয়ে মাজিদ মাজিদি শুরুর দিকের ভাষণ আর শেষ কথা বাদ দিলে তিনি ক্লাসে পারস্য সাহিত্য আর কবিতায় বিচরণ করেছেন। সঞ্চালক যখন তাকে প্রশ্ন করলেন, মাজিদি তার সিনেমায় আধ্যাত্মিকতা আর পোয়েটিক ফর্মকে কেমন করে ব্যবহার করে।

মাজিদি এ প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন প্রায় আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। মনে হচ্ছিল, নিজের প্রিয় কোনো বিষয়ে হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে কথা বলছিলেন। ফারসি সুর, ছন্দ আর কবিতা তাকে কতটা বুঁদ করে রেখেছে তাই বোঝাচ্ছিলেন। বলছিলেন, কীভাবে তিনি দৃশ্যে দৃশ্যে ফ্রেমে ফ্রেমে কবিতার ছোঁয়া দেন। ফারসি সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার তার কতটা বড় শক্তি তাই বোঝালেন। শোনালেন ইসলামের মরমি প্রাণশক্তির কথা যার রস তিনি আস্বাদন করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ঠিক এ জায়গায়ই ইরানি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তার মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।

আর হ্যাঁ, মাস্টারক্লাসের শুরুতে মাজিদ মাজিদি জানালেন, সিনেমায় তার অনুপ্রেরণা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণপুরুষ সত্যজিৎ রায়। তখনো তিনি জানতেন না, দর্শকসারিতে বসা রয়েছেন সত্যজিতের ‘অপুর সংসার’ সিনেমার নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। সঞ্চালক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তিনি তাকে অভিবাদন জানালেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত