যাদের জ্ঞানের আলোয় সমাজ হয় আলোকিত, আলোকিত মানুষ বলতে আমরা তাদেরই বুঝি। যাদের কল্যাণকর চিন্তার বাস্তবায়নে সমাজের উন্নয়ন হচ্ছে, যাদের জ্ঞানের পরশে মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন আসছে, দক্ষ জনসম্পদ গড়ে উঠছে। এ কথা সবারই জানা, আলোকিত মানুষ তৈরির জন্য সুশিক্ষার যেমন প্রয়োজন, আদর্শ শিক্ষকেরও তেমন প্রয়োজন। তেমনি একজন আলোকিত গুণী শিক্ষক মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীক। লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ
যেসব পীর-বুজুর্গের আবির্ভাবে ধন্য হয়েছে বাংলাদেশের মাটি, যারা নিজেদের জীবন-সম্পদ সর্বস্ব মানবকল্যাণে উৎসর্গ করে চিরস্মণীয় হয়ে আছেন, আধ্যাত্মিক জগতের যারা অমর আসন লাভ করেছেন, যারা নবী-চরিত্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি, সালফে-সালেহিনের পদাঙ্ক অনুসারী, সাহাবা আদর্শের অবিকল নমুনা, সরল পথের আকাশচুম্বী মিনারা, দৃঢ় সংকল্প আর হিম্মতের অটল পর্বত, ভ্রষ্টতার আঁধারে আচ্ছন্ন সমাজে প্রদীপ্ত মশাল, বাতিলের মোকাবিলায় উন্মুক্ত তরবারি, আহলে হকের রত্নছায়া ও ভাষ্যকার, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির মূর্তপ্রতীক তাদের অন্যতম হলেন মাওলানা মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীক।
দেশের প্রান্ত জনপদে আলো ছড়ানো এই ব্যক্তিত্ব অনেক উঁচু মাপের একজন আলেম। একজন আদর্শ শিক্ষাগুরু। তার কর্মপন্থা ও আমলের মাঝে আকাবির ও আসলাফের ঝলক পাওয়া যায়। মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীক ১০ মার্চ ১৯৪৫ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সিলেট বিভাগের একটি জেলা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলাধীন জাউয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে তালুকদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম পীর ইউসুফ আলী (রহ.), মায়ের নাম সমুজান বিবি। পিতা-মাতা উভয়ে খুবই দ্বীনদার ও পরহেজগার ছিলেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
হজরতের প্রাথমিক শিক্ষাজীবন নিজ পরিবার থেকেই শুরু হয়। তার বড় চাচা মৌলভি সবরুল্লাহ মুন্সি (রহ.) এবং দক্ষিণ বড়কাপন নিবাসী মাওলানা কাসিদ আলী দেওবন্দি (রহ.)-এর কাছে তিনি কায়দা-সিপারা এবং কোরআনে কারিমের নাজেরাসহ মৌলিক দ্বীনিয়াত শিক্ষা অর্জন করেন। উর্দু পহেলি, দুসরি এবং তালিমুল ইসলাম ১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড তার বড় চাচার কাছে পাঠগ্রহণ করেন। তারপর ১৯৫৬ ইংরেজি সালে তার বড় চাচা তাকে জাউয়া মাদ্রাসায় মক্তব চাহারমে ভর্তি করে দেন। সেখানে তিনি প্রথমপর্বে মক্তব পাঞ্জম পর্যন্ত দু’বছর লেখাপড়া করেন। তারপর তার প্রিয় উস্তাদ হজরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ আলী মনিরগাতী (রহ.)-এর সঙ্গে সুনামগঞ্জের শাখাইতি মাদ্রাসায় চলে যান। সেখানে তিনি সরফ ও নাহবেমির দুটি জামাত দুই বছর লেখাপড়া করেন। ওই মাদ্রাসায় তার উল্লেখযোগ্য উস্তাদ হলেন মাওলানা ইসকন্দর আলী ও মাওলানা মুহিব্বুল হক (রহ.)। সেখান থেকে পুনরায় মনিরগাতী হুজুর (রহ.) জাউয়া মাদ্রাসায় চলে এলে, তিনিও আপন উস্তাদের সঙ্গে জাউয়ায় চলে আসেন। এখানে তিনি হেদায়াতুন্নাহু, কাফিয়া এবং শরহেজামি জামাত পর্যন্ত হজরত মুফতি সাহেবের তত্ত্বাবধানে থেকে তিন বছর লেখাপড়া করেন। তখন জাউয়া মাদ্রাসায় শরহেজামি জামাত পর্যন্ত ক্লাস ছিল।
শরহেজামি পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করে আপন উস্তাদ হজরত মুফতি মাহমুদ সাহেবের পরামর্শে এবং মাওলানা আবদুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (রহ.)-এর দিকনির্দেশনায় উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান চলে যান। সঙ্গে ছিলেন সহপাঠী কাঞ্চনপুর নিবাসী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম (রহ.)। তারা দুজন দারুল উলুম ঈদগাহ কবিরওয়ালা মুলতানে গিয়ে ভর্তি হন। প্রথম বছর বিভিন্ন ফনুনাতে (বিষয়ে) লেখাপড়া করেন। মুখতাসার, হেদায়া, কুতবি, মায়বুজি, সুল্লামুল উলুম, মোল্লা হাসান, শুমুসে বাজিগা, মুসাল্লামুস সুবুত ইত্যাদি বিভিন্নশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য কিতাব প্রথম বছর পাঠগ্রহণ করেন। তারপর সেখানে মিশকাত-দাওরা ও ইফতা শেষ করে আশরাফুল উলুম শুজায়াবাদ মাদ্রাসায় তাফসির এবং কাসিমুল উলুম মাদ্রাসা লাহোরে তাকমিলে তাফসির পড়ে আকাবির ও আসলাফের সনদ গ্রহণ করে ১৯৭২ ইংরেজি সালে বাংলাদেশ ফিরে আসেন।
তার হাদিস ও তাফসিরের সনদে যাদের দস্তখত পাওয়া যায়- শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.), শায়খুত তাফসির আল্লামা আহমদ আলী লাহুরি (রহ.), আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.), মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্দি (রহ.), মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানি (রহ.), মাওলানা কারি মুহাম্মদ তায়্যিব (রহ.), মাওলানা গোলাম গউস হাজারবি (রহ.)। উল্লেখ্য, তাদের কাছে তিনি সরাসরি হাদিস-তাফসির পড়েননি, তবে আশরাফুল উলুম শুজাআবাদ মাদ্রাসার সনদে তাদের ইজাজতস্বরূপ দস্তখত পাওয়া গেছে।
১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে শিক্ষকদের দিকনির্দেশনায় নিজ গ্রামে বড়কাপন ইসলামিয়া আরাবিয়া নামে একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ ইংরেজি সালে জামেয়া মাদানিয়া সুনামগঞ্জের নাজিমে তালিমাতের দায়িত্বও তার কাঁধে ন্যস্ত হয়। তিন বছর যাবৎ অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে সুনামগঞ্জ মাদানিয়া মাদ্রাসার নাজিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর আপন উস্তাদ মুফতি মাহমুদ মনিরগাতী (রহ.)-এর আদেশে ১৪০২ হিজরিতে দারুল উলুম চরমহল্লা আশাকারচর মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে যোগদান করেন। ৪ বছর যাবৎ অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে মুহতামিমের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। তারপর এলাকাবাসীর প্রয়োজনে নিজ গ্রামে চলে আসেন এবং অদ্যাবধি বড়কাপন ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীক ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জগন্নাথপুর উপজেলার কচুরকান্দী গ্রামের সম্ভ্রান্ত ও জমিদার মরহুম তাহির আলি তালুকদারের বড় মেয়ে শামসুন্নাহারের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঔরসে ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তারা সবাই নিজ নিজ অঙ্গনে দ্বীনি কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বড় ছেলে মাওলানা জহুরুল হক, জামিয়া মুহাম্মাদিয়া আখালিয়া সিলেটের মুহতামিম। মেজ ছেলে মুফতি এহতেশামুল হক ক্বাসিমী, জামিয়া দারুল কুরআন সিলেটের শায়খুল হাদিস এবং শিবগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেটের খতিব। ছোট ছেলে হাফেজ মাওলানা আবরারুল হক, সৌদি আরবের আবহা এলাকার কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম। দ্বিতীয় ছেলে মনযূরুল হক বাল্যকালে ইন্তেকাল করেন। চতুর্থ ছেলে মৌলভি ইলহামুল হক দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় বাড়িতে আছেন।
শিক্ষা জীবন শেষে তিনি পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে মাদ্রাসা পরিচালনার পাশাপাশি আকাবির ও আসলাফের গঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতিতে স্বক্রিয় ছিলেন। তিনি জেলা ও থানা পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ছাতক উপজেলার দীর্ঘদিনের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার দরুন সবধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।
মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীক দাওরায়ে হাদিস সমাপন করে তখনকার পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ আলেম মাওলানা আবদুল্লাহ বাহলাবি (রহ.)-এর হাতে বায়াত ও তরিকতের সবক গ্রহণ করেন। তার ইন্তেকালের পর তিনি কায়িদুল উলামা মাওলানা আবদুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শায়খে কৌড়িয়া (রহ.) নিজে বায়াত না করে ফেদায়ে মিল্লাত আল্লামা আসআদ মাদানি (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণের জোর তাগিদ দেন। শায়খে কৌড়িয়ার পরামর্শে তিনি ফেদায়ে মিল্লাত (রহ.)-এর হাতে সলুক ও তরিকতের পুনঃসবক গ্রহণ করেন। তাকেও তিনি বেশিদিন জীবিত পাননি। কিছুদিনের ভেতরে ফেদায়ে মিল্লাতের ইন্তেকাল হয়ে যায়। পরবর্তীকালে তিনি খলিফায়ে মাদানি আল্লামা গাজীনগরী (রহ.)-এর কাছে মুরাজাআত করেন।
মুফতি আবুল বাশার মুহাম্মদ রফীকের দাওয়াতি মিশন ও জিহাদি জজবার কথা আম-খাস সর্বমহলে মোটামুটি জানা। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কর্মপন্থায় বড়কাপনসহ পুরো ছাতক থেকে অনেক বেদআত-রুসুমাত ও খুরাফাত দূরীভূত হয়েছে। বিশেষ করে বড়কাপন আবাসিক এলাকার ১১টি গ্রাম ছিল সামাজিক অনেক ব্যাধিতে আক্রান্ত। মদ-জুয়া, উরস-যাত্রাসহ সব ধরনের পাপের এক অভয়ারণ্য ছিল। তার জিহাদি জজবা ও প্রতিবাদী কণ্ঠের ছোঁয়ায় আজ বড়কাপন এলাকা অনেকটা আদর্শিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। এলাকায় আজ ৪০-৫০ জন আলেম জন্মগ্রহণ করেছেন।
তার ব্যক্তিগত আমলের ব্যাপারে তার জীবনসঙ্গী শামসুন্নাহার বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে আমি উনার শেষ রাতের তাহাজ্জুদ মিস হতে দেখিনি।’ তার মেজ ছেলে মুফতি এহতেশামুল হক কাসিমী বলেন, ‘আব্বাজান প্রতিদিন ৭-৮ পারা কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করেন। এটি তার সারা জীবনের সাধারণ অভ্যাস। আমরা কখনো তাকে নামাজের জামাতে মাসবুক হতে দেখিনি।’ বর্তমানে এই মহান বুজুর্গ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আল্লাহপাক তাকে আমাদের ছায়া হিসেবে সুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ হায়াত দান করুন। আমিন।
