মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ত্রিমুখী সংঘর্ষে এবার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এপারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তবর্তী এলাকায়। গতকাল শনিবার তমব্রু-ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি কমলেও টেকনাফ সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সে দেশ থেকে ছোড়া গুলি এসে বাংলাদেশের বাড়িঘর ভেদ করেছে। এতে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে দুটি পরিবার। এদিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে মিলছে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল। এ ছাড়া উখিয়ার পালংখালীর সীমান্তে পড়ে রয়েছে অজ্ঞাত মরদেহ। সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। সীমান্তের লোকজনকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকালও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু-ঘুমধুম সীমান্ত ও কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের রহমতের বিল শান্ত ছিল। তবে গতকাল ভোরে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝেরপাড়া গ্রামসংলগ্ন সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আড়াই ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি হয়েছে। একই সময় তমব্রুর একটি সবজিক্ষেতে মিলেছে আরেকটি মর্টার শেল।
ঘরে ঘরে আঘাত হানছে মিয়ানমারের বুলেট : গ্রামবাসী থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল ভোর ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা গ্রামে কুমিরখালীতে ব্যাপক গোলাগুলি হয়। ওই সময় মর্টার শেলের বিকট শব্দে হোয়াইক্যংয়ের এপারের গ্রামগুলো কেঁপে ওঠে। একই সময় ওপারের গুলি ও বুলেট মাঝেরপাড়া গ্রামের হাজি আফসারের জানালা ভেদ করে বসতঘরে পড়ে। আরেকটি বুলেট একই এলাকার মনোয়ারার ঘরের টিন ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। অল্পের জন্য রক্ষা পায় পরিবার দুটি। এ ছাড়া অন্য একটি মার্কেটেও একটি বুলেট এসে পড়ে।
হোয়াইক্যং ইউপি চেয়ারম্যান নুর আহমদ আনোয়ারী বলেন, বুলেটে কেউ হতাহত না হলেও গ্রামবাসী ভয়ে ও আতঙ্কে রয়েছে।
হোয়াইক্যং বিওপির কোম্পানি কমান্ডার আবু জানান, গুলির শব্দ ও কয়েকটি বুলেট এপারে এসেছে বলে শুনেছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্তের লোকজনকে সতর্ক থাকার জন্য আগে থেকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রামবাসীকে সতর্ক ও প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া রয়েছে।
তমব্রুর আতঙ্ক মিয়ানমারের ‘মর্টার শেল’ : বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের সীমান্তঘেঁষা ধান ও সবজিক্ষেতে একের পর এক মিলছে মিয়ানমারের অবিস্ফোরিত মর্টার শেল। গত তিন দিনে তমব্রু এলাকা থেকে তিনটি মর্টার শেল উদ্ধার করে বিজিবি। এ ছাড়া গত রবিবার এই মর্টার শেলের আঘাতেই রান্না করার সময় এই ইউনিয়নের এক নারীসহ দুজন নিহত হয়। তাই সীমান্তবাসীর কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের অবিস্ফোরিত মর্টার শেল।
স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সবজিক্ষেতে কাজ করতে যান তমব্রুর পশ্চিমকুল গ্রামের গৃহবধূ হালিমা বেগম। এ সময় তিনি ক্ষেতে একটি মর্টার শেল কুড়িয়ে পান। পরে সেটি তিনি ঘরে নিয়ে যান। তবে এলাকাবাসী এটি ‘অবিস্ফোরিত মর্টার শেল’ জানালে তিনি সেটা তমব্রু সড়কের ওপর ফেলে যান। সেই থেকে সেটি ওখানে পড়ে রয়েছে। তবে সড়কটিকে বিপজ্জনক ঘোষণা দিয়ে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বিজিবি।
এ বিষয়ে তমব্রুর স্কুলশিক্ষক আবদুর রশিদ বলেন, হালিমার যে ক্ষেতে শেলটি পাওয়া গেছি, এটি মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ১৫-২০ মিটার দূরে। পাশেই সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) তমব্রু রাইট ক্যাম্প।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে তিনটি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল পাওয়া গেছে। এর আগে গত সোমবার জলপাইতলী গ্রামে একটি মর্টার শেল পড়ে দুজন নিহত ও একজন আহত হন। একের পর এক মর্টার শেল পাওয়ায় আতঙ্ক কোনোভাবেই কমছে না।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মর্টার শেলটি গত শুক্রবার সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর ও বিজিবির বোমা বিশেষজ্ঞ দল নিষ্ক্রিয় করেছে।
সেই ২৩ উগ্রপন্থি কারাগারে : বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রামে ঢুকে পড়া মিয়ানমারের সেই ২৩ উগ্রপন্থির আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। গতকাল সন্ধ্যায় তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন উখিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক ফাহমিদা সাত্তার।
সীমান্তে পড়ে থাকা মরদেহ উদ্ধার : কক্সবাজারের উখিয়ার বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের মরদেহ পড়ে রয়েছে এমন সংবাদ জানার দুদিন পর বিজিবির সহযোগিতায় মৃতদেহটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল বিকেলে উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালীর রহমতের বিল এলাকায় সীমান্ত বিজিবির সহযোগিতায় মরদেহ উদ্ধার করে উখিয়া থানা-পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহটি দেখতে পান স্থানীয়রা। গ্রামবাসী জানিয়েছে, সীমান্তের এদিক-সেদিক আরও কয়েকটি মরদেহ দেখা গেছে।
উখিয়া থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, পুলিশ একজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া তার পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।
কেন্দ্র অনিশ্চয়তায় ঘুমধুমের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা : আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরু। হাতে সময় আর মাত্র চার দিন। কিন্তু গতবারের মতো এবারও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্র নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে।
এ বিষয়ে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে এবার কুতুপালং নয়, অন্য বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হবে।
টেকনাফ থেকে চলেনি জাহাজ, সেন্টমার্টিন গেল দেড় হাজার পর্যটক : মিয়ানমারের অভ্যন্তরের ত্রিমুখী সংঘর্ষের জেরে গতকাল থেকে বন্ধ রয়েছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল। তবে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানি থেকে দুটি জাহাজে করে প্রায়ই দেড় হাজারের মতো পর্যটক গতকাল সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করেছেন বলে জানা গেছে।
