রাখাইনে দুই পক্ষের লড়াইয়ের লক্ষ্যবস্তু রোহিঙ্গা গ্রাম

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:১৮ এএম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) সঙ্গে সামরিক জান্তার মধ্যে সংঘাতের কারণে আরও এক দফা রোহিঙ্গা শরণার্থী অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কয়েক দিন ধরে ব্যাপক সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর মধ্যে গত সপ্তাহে আরাকান বিদ্রোহীরা অভিযোগ করেছে, রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ জান্তার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তাদের অগ্রযাত্রা রুখতে চাইছে।

আরাকান বিদ্রোহীদের আক্রমণে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের সেনা, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য ও সরকারি কর্মচারীদের অনেকে। ওদিকে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেসামরিক মানুষ। নতুন করে তৈরি হওয়া সংকটে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়হারা হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) একইভাবে শঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, রোহিঙ্গারা আবারও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

আরাকান আর্মিসহ মিয়ানমারের আরও দুটি সংগঠন নিয়ে গঠিত জান্তাবিরোধী জোট ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ জানিয়েছে, আরাকান আর্মির সদস্যরা রাখাইন রাজ্যে প্রাচীন শহর ম্রাউক-ইউ শহরের দখল নিয়েছে। তারা সেখানে জান্তার তিনটি জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে। ম্রাউক-ইউতে সর্বশেষ পুলিশ স্টেশনটিও দখল করেছে আরাকান বিদ্রোহীরা।

আরাকান আর্মি অভিযোগ করেছিল, রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) সামরিক জান্তার পক্ষ নিয়ে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

রাখাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বামারদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস, যার অধিকাংশই মুসলিম। সামরিক জান্তার আক্রমণের মুখে পড়ে গত কয়েক দশকে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে গত দশকে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হয়। এবার আরাকান বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে পড়তে পারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ, এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে জান্তা এবং আরাকান বিদ্রোহী উভয়ের রোষেই পড়তে পারে রোহিঙ্গারা। তবে এরই মধ্যে দুই পক্ষের লড়াইয়ে মার খাচ্ছে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর মানুষ।

এইচআরডব্লিউ বলছে, ‘রাখাইনে গত কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হচ্ছে। মিয়ানমারের জান্তা এবং আরাকান আর্মির লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে রোহিঙ্গা এবং অন্যান্য বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি প্রশমনের দিকে যুদ্ধরত দুই গোষ্ঠীর নজর দেওয়া উচিত।’

গত বছরের ১৩ নভেম্বর আরাকান আর্মি এক বছরের যুদ্ধবিরতির ইতি টেনে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। গত জানুয়ারির পর থেকে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর যেখানে আরাকান যোদ্ধারা ছিল, তা লক্ষ্য করে আক্রমণের ধার বাড়াতে থাকে। বিশেষ করে বুথিডং এলাকায় জান্তার বাহিনী ব্যাপকভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ে হামলা চালায়। আগের সংঘাতের জেরে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অভ্যন্তরীণভাবেই বাস্তুচ্যুত, যাদের নতুন করে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়েছে। আবার একই সময় আরাকান বিদ্রোহীদের সঙ্গেও রোহিঙ্গা যোদ্ধাদের সংঘাতের রেশ বাড়ছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, ‘বেসামরিক হতাহত এবং বাড়িঘর ও সম্পত্তি ধ্বংস হওয়া প্রশমন করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং বিরোধী বাহিনীর সবকিছু করা প্রয়োজন। ২০১৭ সালে যেসব রোহিঙ্গা গ্রাম আক্রমণের মুখে পড়েছিল, সেসব আবারও হামলার শঙ্কায় রয়েছে।’

রোহিঙ্গা অঞ্চলের গ্রামবাসী জানায়, গত জানুয়ারিতে আরাকান বিদ্রোহীরা গ্রামগুলোতে এসে ঘাঁটি তৈরি করে। পরে জান্তাবাহিনী আকাশপথে হামলা করে গ্রামগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। তারা দুই পক্ষের লড়াইয়ের মধ্যে পড়ে অসহায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত