বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ালেখার মান যেমনই হোক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য ছাত্ররা বরাবরই দেশের মানুষের কাছে বাতিঘর হয়ে থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তারুণ্য রীতিমত ভীতিকর হয়ে দাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকদের দলাদলি এবং এই ত্রাসের আগুনে ঘি ঢালা।
এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেল ক্রিকেট খেলা কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের মারধরের ঘটনায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, খেলায় হারার উপক্রম হওয়ায় স্বাগতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা অতিথি দলের ওপর চড়াও হয়।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়, আশ্চর্যজনকভাবে উভয়পক্ষের অভিভাবক অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘটনাটিকে অনাকাঙ্খিত ও অখেলোয়াড়সুলভ আখ্যা দিয়ে স্বাগতিকদের দিকে আঙ্গুল তুলেছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায়। অপরদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবৃতির ভাষাকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে একে প্রত্যাখান করেছে।
তরুণরা একটা ক্রিকেট খেলার জয়-পরাজয় মানতে পারছে না কেন? আমরা একই সময়ে দেখতে পাই জাহাঙ্গীরনগরে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন চলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে ছাত্ররা বিক্ষুদ্ধ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা প্রতিবাদ করছেন ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ তাদের অপমান করেছে এই অভিযোগে।
এই অভিযোগগুলো তলায়ে দেখতে গেলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকদিন ধরেই ছাত্রছাত্রীদের জন্য নরক হয়ে উঠেছে। বিশেষত যেসব ছাত্ররা ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা হলের সিট পাবার জন্য ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতাদের কুক্ষিগত হয়ে থাকছে। একাডেমিকভাবে শিক্ষকরাও যথেচ্ছাচার করছেন। ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগরসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রমরমা মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে। এসবে নেতৃত্ব দেয় ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতা আর এর পেছনে থাকে শিক্ষক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা।
সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, এগুলো একেবারে গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে মেধাবী অংশকে এইরকমভাবে দমন করার ফলাফল হবে ভয়াবহ। তারুণ্য স্বভাবতই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে থাকে। ফলত যে তরুণ হলের জন্য নেতার কাছে মাথা নিচু করে থাকে, পরীক্ষায় পাশের জন্য শিক্ষকের অন্যায় আবদার মেনে নেয়, তাদের রাগটা প্রকাশ হয় পরস্পরের ক্রিকেট খেলায়। আবার এই পরম্পরায় বড় নেতার থেকে পাওয়া অপমান ছোট নেতা দেখায় ক্যান্টিন মালিকের কাছে।
আজকের সংবাদমাধ্যমেই আরেক খবরে দেখা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা এক ক্যান্টিন মালিকের দাড়ি ছিড়ে ফেলেছেন। এই ভয়াবহ দমবন্ধ সংস্কৃতির প্রভাব আরো সুদূরপ্রসারী হয়ে ছড়িয়ে যায় যখন এই ছাত্ররা পড়াশোনা শেষে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে শুরু করে ছোট ছোট অফিসে দায়িত্ব নেন। একটা চাপা ক্ষোভ আর অন্যায়ের সংস্কৃতির দীর্ঘ প্রভাবে এদের অনেকেই মানবিকতা হারিয়ে ফেলেন। ঘুষ খান, অন্যায় করেন। তারা ভুলে যান, এই দেশের মানুষের কষ্টার্জিত করের টাকাতেই তারা পড়ালেখা করেন। দেশের প্রতি দায়িত্ব কোনো বায়বীয় আবেগ নয়, বরং বাস্তব দায়িত্ববোধ।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা তাদের তা ভুলিয়ে দেয়। আজকের দেশ রূপান্তরের বিশেষ সংখ্যায় মাইগ্রেশন নিয়ে কাজ করা একজন বিশেষজ্ঞ জানান, দেশ ছাড়তে চায় প্রায় সব তরুণ। কেন দেশ ছাড়ার এই নেশা? বাবা-মা আত্মীয়, বন্ধু ছেড়ে অচিনভূমিতে যাওয়ার এই বাসনা কি কেবল উন্নত জীবনের আশায়?
না। এর পেছনে একটা বড় কারণ তারুণ্যের অপমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা জানে, এই ভয়াল পরিবেশে মানুষ হিসেবে সম্মানটুকু তো তারা পাবেনই না, উল্টো এর অংশ হলে অন্যদের সম্মানহরণের কুশীলব হতে হবে। ফলত উন্নত জীবন ছাড়াও এরা সব ছেড়ে পালাতে চায়। প্রায় শ্বাপদের মতো জীবনযাপন করা এই শিক্ষিত তরুণদলের ক্রিকেট খেলা নিয়ে মারপিট বড় সমস্যা নয়, বরং সমস্যার একটা বড় উপসর্গ।
ইমরান খানের মুক্তি দাবি রজার ওয়াটার্সের