বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুধু বাজার চাহিদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১০:৩৯ পিএম

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় এক আস্থার নাম ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি গত দুই দশক ধরে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের।  চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নানা বিষয় নিয়ে তরুণোদয়ের মুখোমুখি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই শিক্ষাবিদ বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে চাহিদাসম্পন্ন বিষয়গুলো কী কী?

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের চাহিদাসম্পন্ন বিষয়গুলো হচ্ছে আইন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মেসি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সাইবার সিকিউরিটি, জার্নালিজম ও মিডিয়া স্টাডিজসহ আরও বেশ কটি।

নতুন শিক্ষার্থীরা ভর্তির আগে টিউশন ফি, স্কলারশিপ ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চায়; ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে টিউশন ফিসহ আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে জানতে চাচ্ছি।

আমাদের টিউশন ফি খুবই কম। আমাদের স্কলারশিপের মধ্যে আছে মেধাবৃত্তি ও ফাউন্ডারস স্কলারশিপ। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি নিজে একটা ভাতা পাই, সেটা স্কলারশিপে রূপান্তর করে দিয়েছি। অতি মেধাবীদের এই স্কলারশিপটা দেওয়া হয়। তদুপরি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, পার্বত্য ও অনুন্নত এলাকার অধিবাসী, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, খেলোয়াড়, সাংস্কৃতিক কর্মী বা বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্নদের জন্যও আর্থিক সুবিধা আছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনো না কোনো আর্থিক সহায়তা পেয়েই যায়।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর অনুপাত সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে কোর্সভেদে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে ভিন্নতা আছে। ফার্মেসি বিভাগের জন্য এই অনুপাত ১:১৫। ফার্মেসি কাউন্সিলের নির্দেশক্রমে আমরা এই অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি এবং কিছু অতিরিক্ত ল্যাব, রিডিং রুম ও অন্যান্য সুবিধাবলি সংযোজন করেছি। অন্য বিভাগগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনুপাত ১:২৫। আমাদের পার্টটাইম শিক্ষকের সংখ্যা সামান্য, বড়জোর দুই শতাংশ। আমরা প্রয়োজনে পাশর্^বর্তী বা দূরবর্তী স্থান থেকে শিক্ষক এনে ঘাটতি পূরণ করি। অনেকে পিএইচডি শেষ করার আগেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন কিংবা আমরা তাদের সঙ্গে সংযোগ রাখি। পরে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে থাকি।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতে আপনারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

শিক্ষকদের গবেষণাকে উৎসাহিত করতে আমরা বেতনের সঙ্গে গবেষণা ভাতা যুক্ত করে দিয়েছি। প্রতি বছর শিক্ষকদের গবেষণায় সহায়তার জন্য আমাদের সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম আছে। প্রতি বছর পঞ্চাশের অধিক শিক্ষককে গবেষণার জন্য প্রত্যেককে লক্ষাধিক টাকা দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ তাদের রিপোর্ট সাবমিট করেছে এবং পেপার প্রকাশ করেছে। শিক্ষকদের প্রমোশনের জন্য গবেষণাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন র‌্যাংকিংয়ে প্রথম ৫০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও থাকছে না। আপনি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের বলবেন এর কারণ কী?

বড় কারণ হলো, পড়ানো বা গবেষণার জন্য শিক্ষক নেই। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য যে তিনটি প্রশাসনিক পদ রয়েছে সেগুলোতে নিয়োগ উপযোগী শিক্ষক অপ্রতুল ও নেতৃত্ব সংকট রয়েছে। এই সংকটের জন্যই আমরা র‌্যাংকিংয়ে ভালো করতে পারছি না। তবে অবস্থা বদলাচ্ছে।

আমরাও বিভিন্ন র‌্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো জায়গায় স্থান করে নিচ্ছি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের নিয়োগের ধাপ চারটির বদলে ১২টি করলে, প্রমোশনে পদ পুনর্বিন্যাসে আশ্রয় না নিলে এবং সহকারী অধ্যাপক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রমোশনগুলোতে বাইরের খ্যাতনামা প্রফেসরের মতামত নেওয়া হলে অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন হবে। দেশে উন্নত গবেষণার জন্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন আবশ্যক। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশ থেকে শিক্ষক এনে তাদের অধীনে এমফিল বা পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করলে দেশের শিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়বে।

আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণায় সহযোগিতামূলক প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সঙ্গে পঞ্চাশটিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম রয়েছে। এসব প্রোগ্রামের অধীনে শিক্ষা ও গবেষণার আবহ সৃষ্টিতে সীমিত আকারে আমাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা উপকৃত হচ্ছে, তবে আমাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি ছাত্রদের প্রবেশ এবং বিদেশি শিক্ষকদের অনলাইনে পাঠদান শিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগতমান পরিবর্তন করছে।

আপনি নিজে একজন ১৯৭১-এর সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তার কতটুকু পূরণ হয়েছে?

স্বাধীনতার যুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে, কিন্তু মুক্তির ঈপ্সিত লক্ষ্য আজও এখনো বহুদূর। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি দশ বছরে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারতেন। তার অকাল শাহাদাৎ বরণে আমরা অনেক পিছিয়ে গিয়েছি। তবে তার সুযোগ্য কন্যার ক্ষমতায় আহরণ ও ক্ষমতায় দীর্ঘ অবস্থান বঙ্গবন্ধুর অনেক স্বপ্নই বাস্তবায়িত হয়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাংলাদেশকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছেন। আমরা স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। আগামী ২০ বছরে তার স্বপ্নের স্মার্ট বাংলাদেশই আমাদের উচ্চ আয়ের ও উচ্চ মর্যাদার দেশে রূপান্তরিত করবে।

আপনি দেশ গড়ার কাজেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় আপনার ভূমিকা রয়েছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন দরকার বলে আপনি মনে করেন?

আমি একাধিক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমার উপলব্ধি, আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষিত লোকের সংখ্যা যথেষ্ট। তবে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত লোকের সংখ্যা সীমিত। আমাদের অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষার কারণে তারাই অধিক বেকার এবং দেশ ও সমাজের বোঝা। আমাদের কোয়ালিটি এডুকেশন দিতেই হবে। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা না হলে দেশে ভালো চাকরি পাওয়া যাবে না, উদ্যোক্তা হতে হলেও ইংরেজিতে দক্ষতা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুধু বাজার চাহিদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার দিকে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত