শবে বরাতে আতশবাজি ও হালুয়া-রুটির প্রচলন যেভাবে

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৪ পিএম

ঢাকার মানুষ শবে বরাত বলতে বুঝতো এমন একটি দিনকে, যেদিন সবার ঘরে ঘরে হালুয়া তৈরি করা হবে ও তা বিতরণ করা হবে আত্মীয়-স্বজন ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে। মসজিদে মসজিদে সারারাত জিকির করা বা নামাজ পড়ায় ব্যস্ত থাকবে পুরুষরা। আর সন্ধ্যার পর পোড়ানো হবে আতশবাজি।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শবে বরাতে আতশবাজি পোড়ানো ও আলোকসজ্জা করার রীতি কয়েকশো বছরের পুরনো। ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিদ্যাধর মহাজন তার বই ‘হিস্টরি অব মিডিইভাল ইন্ডিয়া’য় লিখেছেন যে দিল্লির সুলতানদের আমলে এবং মোঘল আমলে শবে বরাতের রাতে বাদশাহদের প্রাসাদ ও মসজিদ আলো দিয়ে সাজানো হত।

মোঘল আমলে শবে বরাত পালনের এই চিত্র উঠে এসেছে পার্বতী শর্মার ‘জাহাঙ্গির: অ্যান ইনটিমেট পোর্ট্রেট অব এ গ্রেট মোঘল’ বইয়েও, যেখানে সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে (১৬০৫-১৬২৭) শবে বরাত উদযাপনের সময় হালুয়া মিষ্টি জাতীয় খাবার বিতরণ ও আলোকসজ্জা করা হত বলে লিখেছেন তিনি।

১৮৮০ সালে প্রকাশিত বৃটিশ পাদ্রী এডওয়ার্ড সেলের লেখা বই ‘ফেইথস ইন ইসলামে’ উঠে আসে যে সেসময় আতশবাজির পেছনে বিপুল পরিমাণ খরচ করা হত। এডওয়ার্ড সেল ১৮৬৫ সাল থেকে তৎকালীন ভারতবর্ষের মাদ্রাজে পাদ্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে শবে বরাত পালনের সবচেয়ে পুরনো প্রমাণ পাওয়া যায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, প্রায় দেড়শো বছর আগে। সেসময় ঢাকার নবাবরা ঘটা করে শবে বরাত পালন করতেন বলে বলছিলেন ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। যিনি বাংলাদেশের উৎসবের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছেন ও বই লিখেছেন।

তিনি বলেন, সে সময়ে হিন্দুদের আধিপত্য থাকার কারণে সেটিকে মোকাবেলা জন্য ঢাকার নবাবরা শব-ই-বরাত জন্য অনেক বড় আয়োজন করতো। এতে ঢাকার নবাবদের মুসলমান পরিচয় এবং আধিপত্য - এ দুটো বিষয় একসাথে তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যেত।

অধ্যাপক মামুন বলেন, নবাবরা যেহেতু মুসলিম ছিলেন এবং ঢাকাকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেজন্য উৎসবগুলোকে তারা গুরুত্ব দিতেন। এর মাধ্যমে নবাবদের আধিপত্য, মুসলমানদের আধিপত্য এবং ধর্ম পালন এই তিনটি বিষয় একসাথে প্রকাশ হতো।

১৯'শ শতকের শেষের দিকে ঢাকায় শবে বরাত পালন মুসলিম পরিচয় প্রকাশের বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এমনটাই বলছেন অধ্যাপক মামুন। সেই ধারাবাহিকতায় শবে বরাত একটি বড় ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। 

তবে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিমের মতে আরো আগে থেকেই বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে শবে বরাত পালন হয়ে আসছে। আরব আর চীনা বণিকরা যখন সাগরপথে ব্যবসা করতে আসতো, তখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের জাহাজ ভিড়তো। সেসময় তাদের অনেকেই এখানে থেকে যেতেন। তাদের মাধ্যমে ইসলামিক রীতি-রেওয়াজের সাথে সেখানকার মানুষের পরিচয় হয়েছিল।

তার মতে ঢাকার নবাবরা জাঁকজমকের সাথে শবে বরাত পালন করলেও তারও কয়েকশো’ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডের মানুষ এই রেওয়াজের সাথে পরিচিত ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত