শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই করের বোঝা!

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫০ এএম

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উদ্বৃত্ত অংশের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে বলে সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে, যা নিয়ে গত মঙ্গলবার থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি তথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলরের কাছেও যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টিরা বলছেন, কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয় বাদে অন্যরা ভালো অবস্থানে নেই। স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অব্যাহত চাপে অনেকেই এক প্রকার যুদ্ধের মাঠে রয়েছে। এ অবস্থায় যদি উদ্বৃত্ত আয়ের ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়, তাহলে তা শিক্ষার্থীদের ঘাড়েই পড়বে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবেই টিউশন ফি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প উপায় থাকবে না। নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজ থমকে যাবে।

জানা যায়, দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৪টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৫টি। জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৪ লাখ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র খরচে পড়ার সুযোগ পায়। খরচের প্রায় পুরোটাই সরকারি তহবিল থেকে মেটানো হয়। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার এক টাকাও দেয় না। পুরো শিক্ষাব্যয়ই মেটাতে হয় অভিভাবকদের। আর এতে পড়ালেখা করা বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর আরোপের বিষয়টি পুরনো। এতদিন তা হাইকোর্টের রায়ে আটকে ছিল। এখন সর্বোচ্চ আদালত তা নিষ্পত্তি করে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে বলে আদেশ দিয়েছেন। এখন আদালতের আদেশ আমাদের মানতে হবে। তবে আমরা এ ব্যাপারে রিভিউ করব। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করব। আমরা রাষ্ট্রপতি তথা চ্যান্সেলরের কাছেও আবেদন করব। কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটা ট্রাস্টের অধীনে চলে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ ও ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী উদ্বৃত্ত আয়ের ওপর কর ধার্য হওয়ার কথা নয়।’

শেখ কবির হোসেন আরও বলেন, ‘যদি কর দিতেই হয়, তাহলে ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নয়ন হবে না। এখন বড় বিশ্ববিদ্যালয় হাতেগোনা কয়েকটা। তাহলে ১০০-এর বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ই সমস্যায় পড়বে। ট্রাস্টিরা সরে যাবে। স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়তে হবে। এতে টিউশন ফি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় হাতে থাকবে না। আর নয়তো বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হবে। এখন সরকারের যদি কর নিতেই হয়, তাহলে আইন পরিবর্তন করুক। কোম্পানি আইনে বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর সুযোগ দিক। এতে যারা ট্রাস্টে থাকবে তারা একভাবে চলবে আর যারা কোম্পানি আইনে তারা আরেকভাবে চলবে।’

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বলব, যে সিদ্ধান্ত এসেছে সেটা আমাদের জন্য অনাকাক্সিক্ষত। এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বড় সংকটের মধ্যে পড়বে। শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ ক্ষতির মুখে না পড়লেও পরোক্ষ ক্ষতির মুখে পড়বে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমস্যায় পড়ে তাহলে শিক্ষার্থীরাও তো সমস্যায় পড়বে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উদ্বৃত্ত টাকায় উন্নয়নকাজ করা হয়। কিন্তু কর দিতে হলে তা বন্ধ হবে। আর যদি তা ২০০৭ সাল থেকে দিতে হয় তাহলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই দেউলিয়া হয়ে যাবে।’

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী আরও বলেন, ‘এভাবে চললে দেশে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপ্রবেশ ঘটবে। ইতিমধ্যে এসেও পড়েছে। তারা যেহেতু লাভ নিচ্ছে। তাই তাদের কর দিতে সমস্যা নেই। কিন্তু ব্যাপারটি গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। কারণ এতে দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে। শিক্ষার্থীদের দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে অল্প কিছু আয়ের জন্য সরকার বড় সংকটে পড়বে। তবে আমি কোনোভাবেই শিক্ষা বাণিজ্যকীকরণের পক্ষে নয়। তাহলে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান লিয়াকত সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর আরোপের ফলে যেসব বড় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যাদের টিউশন ফি বেশি; তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর তাদের কর দিতে অসুবিধাও নেই। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়ে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা খুবই কম টাকায় পড়ে। আমরা ভর্তুকি দিয়ে চলি। আমাদের মতো যেসব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মকানুন ও আইন মেনে চলতে চায়, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ করের চাপ তো শিক্ষার্থীদের ওপর পড়বেই।’

২০০৭ সালের ২৮ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয় যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তাদের উদ্ভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয়কর পুনর্নির্ধারণ করা হলো। ১ জুলাই থেকে এটা কার্যকর হবে।’

আবার ২০১০ সালের ১ জুলাই এনবিআরের আরেক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের উদ্ভূত আয়ের ওপর প্রদেয় আয়করের হার হ্রাস করে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো।’

এরপর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৪৬টি রিট করা হয়। ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওই দুটি প্রজ্ঞাপন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেয় আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এ আপিল নিষ্পত্তি না পর্যন্ত এ আয়কর আদায় থেকে বিরত থাকতে এনবিআরকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে গত মঙ্গলবার ওই আপিলের শুনানিতে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে বলে রায় দিয়েছে আপিল বিভাগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত