রাজধানীর বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ২০জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও আটজন শিশু মারা গেছে। নিহতদের মধ্যে ৪০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। ৩৮ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর দুইজনের মরদেহ মর্গের ফ্রিজে রাখা হয়েছে। বাকি ছয়জনের জনের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (১ মার্চ) সন্ধ্যায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ক মিডিয়া ব্রিফিং এসব তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ মহিদ উদ্দিন।
এদিকে কোমলমতি শিশুদের মুখচ্ছবিগুলো দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্বজনরা। কেউ স্ত্রীসহ সন্তান হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন ভাগ্নে ও ভাতিজাকে। সারাদিন বাড়ি মাতিয়ে রাখা সন্তাদের হারিয়ে তাই অনেকেই বাকরুদ্ধ। এমনি একটি পরিবার ছিল ছায়েক আহমেদ আশিকের। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ভয়াল আগুন তার বুক খালি করেছে। তাই দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা। স্ত্রী নাফিজা আক্তার (৩০), ৭ বছরের আরহান ও সাড়ে ৩ বছরের আদিয়াতসহ তিন সদস্যকে হারিয়ে বিলাপ আর সৃষ্টিসকর্তার প্রতি আশ্রয় প্রার্থনা করছেন তিনি। অনবরত হৃদয় বিদীর্ণ করা কান্না আর বিলাপ ছুঁয়ে যাচ্ছে স্বজন ও এলাকার মানুষদের।
সরেজমিনে শুক্রবার (১ মার্চ) দুপুরে নোয়াখালী পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের মোস্তফা কন্ট্রাক্টর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের আহাজারি। এলাকার অগণিত মানুষের ভিড়। এ সময় নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী ওই বাড়িতে ভিড় জমায়। স্বজনদের কান্নায় সেখানে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আকস্মিক এমন করুণ মৃত্যুর খবরে এলাকাবাসী হতবাক হয়ে যান। জুমার নামাজের পর পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় মা ও দুই সন্তানদের মরদেহ।
স্বজনরা জানান, বেইলি রোডের খুব নিকটেই তাদের বাসা। নাফিজা আক্তার তার বড় ছেলে আরহানের পরীক্ষা শেষ হওয়ায় দুই ছেলেকে নিয়ে বেইলি রোডের কাচ্চি ভাইতে রাতে খেতে যান। তার স্বামী যাওয়ার কথা থাকলেও কোনো এক ব্যস্ততায় তিনি যেতে পারেননি। না গিয়ে তিনি হয়তো বেঁচে গেছেন কিন্তু স্ত্রী ও আদরের সন্তানদের হারিয়ে এখন বেদনায় মুহ্যমান। বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) রাত পৌনে ১০টার দিকে ভবনটিতে আগুন লাগে।
আশিকের শ্বশুর মো. জাকারিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, সন্তানদের নিয়ে খেতে গিয়েছিলো ফিরলো লাশ হয়ে। ওরা অগ্নিকান্ডে পুড়ে মারা যায়নি আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে দমবন্ধ হয়ে মারা গেছে।
তাদের মতো ভাগ্নে সান রায় (১০), ভাগ্নি সম্পূর্ণা রায় (১২) ও বোন পপি হারিয়েছেন পীযূষ পোদ্দার। গতকাল আগুনে পুড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তাদের হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ তিনি।
আগুনে আটকা পড়ে তার ভাগ্নে ফোনে মামা পীযূষ পোদ্দারকে বলেন, ‘মামা আমাকে এখান থেকে বের করো। এখানে চারদিকে আগুন-ধোঁয়া। আমরা বের হতে পারছি না। ধোঁয়ায় নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। তুমি আসো। আমাদেরকে এখান থেকে বের করো’। কিন্তু তাদের বাঁচাতে পারেননি তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে পীযূষ বলেন, ‘ভাগ্নি আমাকে বলেছে, মামা তুমি আসো। কিন্তু আমি কীভাবে যাব? সামনে-পিছনে সবখানে আগুন। সবকিছু জ্বলে-পুড়ে শেষ। আমার কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছে। কিন্তু বাঁচাতে আর পারলাম কই? ভাগ্নির লাশ আমি কীভাবে দেখব? আমার পক্ষে ওই মরদেহ দেখা সম্ভব না।’
এদিকে রাজধানীর বেইলি রোডে আগুনের ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজালাল উদ্দিন (৩৪) ও তার স্ত্রী-সন্তানের লাশ শনাক্ত করেছে স্বজনরা। তার স্ত্রী গৃহিণী মেহেরুন্নেছা জাহান হেলালী (২৪) ও সাড়ে ৩ বছরের মেয়ে ফায়রুজ কাশেম জামিরা। আজ শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে এসে তাদের ৩ জনের লাশ শনাক্ত করেন শাহজালালের শ্বশুর মুক্তার আলম হেলালী।
তিনি জানান, শাহজালাল সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তার অফিস ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও। কক্সবাজার উখিয়া থানার পূর্ব গোয়ালিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ডা. আবুল কাশেমের ছেলে শাহজালাল।
তিনি বলেন, শাহজালাল স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের বসুন্ধরা রিভারভিউ এলাকায় থাকতেন। শাহজালাল অফিস থেকে ৩ দিনের ছুটি পেয়েছিলেন। সেই ছুটি কাটাতে পরিবার নিয়ে খাগড়াছড়ি ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই অনুযায়ী রাজারবাগ এলাকায় গ্রিন লাইন বাসের টিকেটও কেটেছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতে বাসে চড়ে রওনা দেবে। সেই জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ৩ জন বাসা থেকে রওনা হন। এরপর বেইলি রোডে ওই ভবনের কোনো একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে উঠেছিলেন। সেখানেই আগুনে পুড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
