আগুনে পুড়ে যাওয়া চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গুদামে থাকা চিনির ৮০ শতাংশই রক্ষা পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার ইছানগর এলাকায় আগুন লাগা চিনিকল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
ফায়ারের ডিজি বলেন, আগুন লাগা গুদামটি ১২০ মিটার লম্বা। সেখানে থাকা এক লাখ টনেরও বেশি চিনির ৮০ শতাংশই রক্ষা পেয়েছে। আর ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত তা বের করতে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি কাজ করছে।
তিনি বলেন, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় এখনো হালকা আগুন দেখা যাচ্ছে। হয়তো বিকেলের মধ্যে আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হবে। ডিজি আরও বলেন, আগুন দেরিতে নিয়ন্ত্রণে আসার কারণ হলো যে কাঁচামালগুলো ছিল সেগুলো দাহ্য। পানি দেওয়ার পরও আবার জ¦লে ওঠে।
এদিকে আগুনে যেটুকু ক্ষতি হয়েছে তাতে বাজারে চিনির সরবরাহ ও দামে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তারা। তারা বলেন, পুড়ে যাওয়া গুদামটিতে এক লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত চিনি ছিল। বাকি গুদামগুলোতে বর্তমানে ৬ লাখ ৪১ হাজার টন চিনির কাঁচামাল রয়েছে।
এস আলম গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আকতার হাসান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রমজানে মিল থেকে চিনি সরবরাহে কোনো প্রভাব পড়বে না এবং শনিবার থেকে পুরোদমে পরিশোধিত চিনি বাজারে যাবে। আর আগুন থেকে যে চিনি রক্ষা পেয়েছে,তা বিএসটিআইসহ বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি।
গত সোমবার বিকেল পৌনে ৪টায় কর্ণফুলী নদীপাড়ে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গুদামে আগুন লাগে। একই স্থানে অপরিশোধিত চিনি রাখার পাঁচটি গুদাম ছিল। যে গুদামটিতে আগুন লেগেছে, তাতে এক লাখ টনের বেশি অপরিশোধিত চিনি ছিল বলে দাবি করেছে কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, কোস্ট গার্ড, র্যাব ও পুলিশের পৃথক দল ঘটনাস্থলে যায়। গত সোমবার রাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে পুরোপুরি নেভানো যায়নি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রহমানকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনতিবিলম্বে চিনিকলের গুদামের পোড়া বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এখনো পোড়া চিনিমিশ্রিত লাভা নদীতে যাচ্ছে। আমরা কারখানা কর্র্তৃপক্ষকে এই মুহূর্তে বর্জ্যমিশ্রিত পানি নদীতে ফেলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। তারা তাদের কারখানার আশপাশে এ বর্জ্য মেশা পানি ফেলার ব্যবস্থা করবে।’
এদিকে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের গুদামে আগুনে পুড়ে যাওয়া চিনির কাঁচামাল কর্ণফুলীতে মেশার পর নদীর পানিতে অ্যাসিডের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ কারণে নদীর পানি মৎস্য ও জলজ প্রাণীর অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে এ তথ্য জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার।
কর্ণফুলী ইছানগর-বাংলাবাজার ঘাট সাম্পান মালিক সমিতির সভাপতি লোকমান দয়াল জানান, মঙ্গলবার রাতে এস আলম সুগার মিলের দেয়াল কেটে পোড়া লাভামিশ্রিত পানি পাশের নালায় ছেড়ে দিলে তা নদীতে এসে পড়তে শুরু করে। এ সময় নদীতে জোয়ার থাকায় ওই বর্জ্য জোয়ারের পানিতে ভেসে কালুরঘাট পার হয়ে হালদা নদী পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।’
চিনি পোড়া বর্জ্যে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকির পাশাপাশি দূষণে মরছে নদীর মাছ। গত বুধবার থেকে কর্ণফুলী নদীতে মৃত মাছ ভেসে উঠতে দেখে স্থানীয়রা হাতে ও জাল ফেলে ধরছে। সেদিন নদী থেকে মৃত মাছ ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে জেলা মৎস্য দপ্তর। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ বলেন, দূষণের কারণে নদীতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। যার কারণে নদীতে এখন পর্যন্ত ১১ প্রজাতির মাছ ও কাঁকড়া মারা গেছে।
