টাঙ্গাইলে সম্প্রতি প্রত্যেক উপজেলার সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) জন্য চালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগকৃত চালকদের অভিজ্ঞতা না থাকায় যোগদানের পর থেকেই গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসিল্যান্ডদের গাড়িগুলো।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের ০৩ মার্চ ৯ জন নতুন চালককে স্ব স্ব উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগদানের জন্য অফিস আদেশ দেওয়া হয়। ওই অফিস আদেশে স্বাক্ষর করেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. ওলিউজ্জামান। তবে অদক্ষ চালকদের তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এসিল্যান্ডদের গাড়ির চালকরা (অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ০৩ মার্চ যোগদানের পরই জেলার ভূঞাপুর, নাগরপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল, কালিহাতী ও ঘাটাইল উপজেলার এসিল্যান্ডের গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। এতে গাড়িগুলোর লুকিং গ্লাস ও ব্যাক লাইট ভেঙেছে এবং গাড়ির বডি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে নাগরপুরে এসিল্যান্ডের গাড়ি উপজেলার মাহমুদনগর এলাকার ফাজিল মাদ্রাসার সামনে একটি মোটরসাইকেলের সাথে সংঘর্ষ হয়। এতে দুই আরোহী গুরুতর আহত হয়। এসব দুর্ঘটনার পর থেকেই ওসব এসিল্যান্ডদের গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণের জন্য এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হয়। আবার কোনো কোনো উপজেলার চালকরা এসিল্যান্ডের গাড়ি নিয়ে মাঠে-পথে ট্রেনিং করছে অন্য চালকদের সহায়তায়। নতুন চালকদের অদক্ষতার কারণে মৃত্যুঝুঁকিতে কর্মকর্তারা। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (০৭ মার্চ) বাসাইল এসিল্যান্ডের গাড়ি নিয়ে নতুন চালক কোর্ট মাঠে ইউএনওর গাড়ির চালকের সহায়তায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এছাড়া প্রশিক্ষণ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ধনবাড়ি, নাগরপুর ও বাসাইলের চালকদের এক সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হয়েছে।
নাগরপুর সহকারী কমিশনার (ভূমি) গাড়ির চালক আলি জোবায়ের বলেন, যোগদানের পর দুইবার ঘটনা ঘটেছিল। একবার গাড়ি ঢালু থেকে নামার সময় ব্যাক লাইটের ক্ষতি হয় এবং পরের দিন একটা মোটরসাইকেলের সাথে লাগে। এতে কেউ তেমন আহত হয়নি। সাধারণ মানুষ নিয়ে গাড়ি চালানো আর ম্যাজেস্ট্রিট নিয়ে গাড়ি চালানো এক নয়। নিয়োগের পর প্রশিক্ষণের দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে টাঙ্গাইল কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) থেকে চার মাসের কোর্স করেছিলাম। এরপর আর প্রফেশনালভাবে চালানো হয়নি। পরে ওই বছরেই বিআরটিএ থেকে হালকা/মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স পাই।
বাসাইল এসিল্যান্ডের গাড়ির নিয়োগ পাওয়া নতুন চালক বলেন, প্রতিষ্ঠানিকভাবে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণের কোনো সার্টিফিকেট নেই। গত বছর জেলা বিআরটিএতে পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স পেয়েছি। গত বৃহস্পতিবার বাসাইলের কোর্ট মাঠে এসিল্যান্ডের গাড়ি দিয়ে ইউএনও স্যার গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সাথে ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ছিলেন।
ভূঞাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনারের গাড়ির নতুন চালক সবুজ মিয়ার পরিবর্তে সাদিকুল ইসলাম নামে এক চালককে ভাড়া করা হয়েছে গাড়ি চালানোর জন্য। ওই সাদিকুলই গত ৪ মার্চ হতে এসিল্যান্ডের গাড়ি চালাচ্ছেন।
এসিল্যান্ডের 'ভাড়াটে' চালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, নতুন চালক সবুজ মিয়া গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমাকে দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওই নতুন চালক আমার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আগামী রবিবার জেলায় মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে গাড়ি নিয়ে যেতে বলেছেন স্যার।
ভূঞাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনারের গাড়ির চালক সবুজ মিয়া বলেন, এসিল্যান্ড স্যারের গাড়িতো আগে চালাইনি। গাড়িটি আমার কাছে নতুন তাই প্রথমে একটু সমস্যা হয়েছিল। পেছনের লাইটের কভার খুলে পড়েছে কিন্তু ভেঙে যায়নি।
অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক এসিল্যান্ডের চালকরা জানান, নতুন চালকরা যোগদানের পরই গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাদের মধ্যে চার উপজেলার চালকদের ছুটিতে পাঠিয়েছে।
অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক গোপালপুর উপজেলা এসিল্যান্ডের চালক আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল স্থায়ী নিয়োগের আশা দিয়ে। কিন্তু আমাদের নিয়োগ না দিয়ে অদক্ষ চালকদের নিয়োগ দিয়েছে। তারা যোগদানের পরই গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এছাড়া আমাদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। পরে উচ্চ আদালত হতে আমাদের চাকরি কেন আত্মীকরণ করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন। কিন্তু সেই উচ্চ আদালতের আদেশের রুল থাকার পরও তড়িঘড়ি করে নতুনদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
নাগরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভ‚মি) মো. আব্দুল মালেক বলেন, গাড়ি দুর্ঘটনার তথ্য আপনাকে দিতে বাধ্য নই। পরে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে ফোন কেটে দেন।
ভূঞাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, নতুন চালক তেমন দক্ষ না। গাড়ি একটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ওই চালক রাস্তাও তেমন চেনে না। তাই তার সাথে একজন চালককে রাখা হয়েছে।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বিশেষ করে সরকারি গাড়িচালকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ওই চালকের অভিজ্ঞতা ও লাইসেন্স আছে কি-না বা পূর্বে যেখানে চাকরি করতে সেখানে কেমন ছিল এগুলো যাচাই করতে হবে। যোগদানের পরও তাকে আরও ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তারপর তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া উচিত। নইলে ওই চালক যাকে বহন করবেন তিনি ঝুঁকিতে পড়বেন।
জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. ওলিউজ্জামান বলেন, নিয়োগ শর্তাবলিতে অভিজ্ঞতার বিষয়টি ছিল না। তারপরও নিয়োগ পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়েছে শুধুমাত্র তাদেরকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিয়োগকৃতরা অভিজ্ঞ না। কয়েকটি উপজেলায় এমন হচ্ছে বিধায় বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) স্যারকে অবহিত করা হবে।
