‘বঙ্গবন্ধু’ শুধু একটি উপাধি নয়

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৪, ১১:৫৬ এএম

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মা তাকে ডাকতেন ‘খোকা’ বলে। অজপাড়াগাঁয়ের সেই খোকাই বাঙালি জাতির মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্কুল জীবনেই তিনি রাজনীতি শুরু করেন এবং সান্নিধ্য লাভ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো মহান নেতাদের এবং দাবি জানান ছাত্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠার। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তার স্বল্প জীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটে গেছে জেলখানার অন্ধকারে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাঙালি জাতির নিজস্ব ভূমিসত্তা থাকবে, যে ভূমিতে বাঙালি তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবে, তার নীতি সে নিজেই পরিচালনা করতে পারবে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে সততাই ছিল মূল চালিকাশক্তি। এই সততার শিক্ষা তিনি পেয়েছেন পরিবার থেকেই।

স্নেহময় বঙ্গবন্ধু : এদেশের জনগণকে বঙ্গবন্ধু এতটাই ভালোবাসতেন যে, প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের প্রশ্নোত্তরে বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। আর আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে যে, আমি আমার জনগণকে অত্যধিক ভালোবাসি।’ তিনি দেশের সাধারণ মানুষ, যারা আজও দুঃখী, যারা আজও নিরন্তর সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন, তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উপজীব্য করার জন্য শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রতি আহ্বান জানান।

দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদর্শী নেতা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও, তাতে বাঙালির কোনো লাভ হবে না। বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান নেতা বঙ্গবন্ধু এটি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন এবং সে সময় থেকেই তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। ‘ইতিহাসে তিনিই অমর, যিনি তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং জাতিকে স্বপ্ন দেখান’ যা বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করেন। এ কারণেই তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ শুধু একটি নামের উপাধি নয়; একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। যতদিন বাঙালি থাকবে, বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জনগণ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

আপসহীন বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধু জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই সংগ্রাম করে গিয়েছেন সাধারণ মানুষের জন্য। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, সোনার বাংলা গড়ার। জনগণের অধিকার আদায় করতে গিয়ে প্রায় ১৩ বছর জেলখানার অন্ধকারে তিনি কাটিয়েছেন। তবুও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন।

অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধু : ১৯৪৭ এর দেশভাগের পরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে গেলে তিনি তার কর্মীদের নিয়ে দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেন। দাঙ্গায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। মানুষকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কখনো হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ করেননি। ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণায় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়, যা তার অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার ফল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রচিত সংবিধানেও বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন, সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করেন।

বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু : বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। তার বিচক্ষণতার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে। সেদিন সমগ্র ঢাকা শহর পশ্চিমা বাহিনী দ্বারা ঘেরাও করা ছিল। তিনি জানতেন আজ যদি স্বাধীনতার ঘোষণা করা হয়, তাহলে পশ্চিমা বাহিনীর গুলিতে লাখ লাখ তাজা প্রাণ ঝরে যাবে। তাই তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে ঘোষণা করেন যে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। আমরা মরতে যখন শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ বঙ্গবন্ধু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে, জনসাধারণকে আসলে স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান জানান।

মহানায়ক বঙ্গবন্ধু : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। ঠিক তখনই মহানায়ক গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে দিয়ে যান তার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্দেশনা। তিনি বাঙালি জাতিকে দিয়ে যান মুক্তির বার্তা অর্থাৎ মহান স্বাধীনতার ঘোষণা। যার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা অর্জন করি প্রাণের স্বাধীনতা।

দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধু : নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি বিশ্বকে আলোকময় করেছেন, সর্বদাই নিপীড়িত মানুষের কথা ভেবেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মহান উক্তি ‘এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়।’

জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল ভালোবাসাই বঙ্গবন্ধুকে নায়ক থেকে মহানায়কে পরিণত করে এবং তিনি হয়ে ওঠেন জাতির জনক। মানুষকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার দর্শন, নীতি ও আদর্শকে হত্যা করা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তারা হত্যা করতে পারেনি- বঙ্গবন্ধুর দর্শন, নীতি ও আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর জীবন-দর্শন, কর্ম ও নেতৃত্বের বহুমাত্রিক গুণাবলির মধ্যেই নিহিত রয়েছে আদর্শ মানুষ ও সুনাগরিক হওয়ার সব উপাদান।

লেখক : সাবেক সচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত