আসল মধ্যস্থতাকারী যাচাই করাই চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৪, ০৩:৫৩ পিএম

জলদস্যুদের পক্ষ থেকে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পর সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে জিম্মি ২৩ নাবিক ও জাহাজ উদ্ধারে মধ্যস্থতাকারী সঠিক কি না সেটা নিশ্চিত হওয়ায় এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে যোগাযোগ হওয়ায় আগের বারের তুলনায় এবার কম সময়ে জিম্মি মুক্তির বিষয়ে আশাবাদী মালিকপক্ষ।

গত বুধবার জাহাজের মালিকপক্ষ কেএসআরএম কর্তৃপক্ষকে জলদস্যুদের পক্ষ থেকে ফোন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পরিচয় জানা ও জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফোন করা সেই ব্যক্তি আদৌ জলদস্যুদের প্রতিনিধি নাকি অন্য কেউ, এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। মেরিটাইম খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওই ব্যক্তি সঠিক মধ্যস্থতাকারী কি না তা শনাক্ত করা জিম্মি উদ্ধার প্রক্রিয়ায় এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২০১০ সালে কেএসআরএম গ্রুপের মালিকানাধীন এমভি জাহান মনিতে জলদস্যুদের কবলে পড়ে ১০০ দিন জিম্মি থাকা নাবিক শরীফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মধ্যস্থতার সময় অনেকগুলো গ্রুপ দাঁড়িয়ে যায়। তাই সঠিক মধ্যস্থকারী কোনটি তা জাহাজ মালিকপক্ষকে শনাক্ত করতে হয়। যেহেতু কেএসআরএম গ্রুপ ২০১০ সালে একবার তা মোকাবিলা করেছে, তাই এবার তাদের জন্য সহায়ক হবে। শরীফুল ইসলাম বর্তমানে অন্য একটি বাণিজ্যিক জাহাজের চিফ অফিসার।’

জিম্মি মুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় মাঝে মাঝে নাবিকদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন জিম্মি থাকা জাহান মনির আরেক নাবিক মুহাম্মদ ইদ্রিস। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে তারা (দস্যুরা) এসে বলত আজ অমুককে মেরে ফেলব। মালিকপক্ষকে টাকা দেওয়ার কথা বলত। তবে এগুলো যে টাকা আদায়ের কৌশল তা আমরা বুঝতাম। তারপরও ভয়ে ভয়ে

থাকতাম।’

জলদস্যুদের পক্ষ থেকে যেহেতু ফোন এসেছে, এখন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটি মাধ্যম পাওয়া গেছে বলে জানান, জাহাজের মালিক কর্তৃপক্ষ কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করব তাদের বিষয়ে যেমন আমাদের নিশ্চিত হতে হবে, তেমনি আমরাও যে জাহাজের মালিক গ্রুপ সেই বিষয়টিও তাদের নিশ্চিত হতে হবে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি।’

এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কী পরিমাণ সময় লাগতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘২০১০ সালে এমভি জাহান মনি জিম্মির প্রায় সাত দিনের মাথায় দস্যুদের কাছ থেকে ফোন এসেছিল। এবার এলো ৯ দিনের মাথায়। তবে এবার জিম্মিদের মুক্ত করতে গতবারের তুলনায় সময় কম লাগতে পারে।’

আলোচনায় কোন কোন বিষয় উঠে আসতে পারে এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান বলেন, কেএসআরএম যেহেতু আগে এ বিষয়ে হ্যান্ডেল করেছে, তাই এ বছর তাদের জন্য সহজ হবে। তবে আলোচনা চলার সময় নাবিকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, তাদের পর্যাপ্ত খাবারের জোগান দেওয়া, জাহাজের তেল খরচ, জাহাজটি কীভাবে উদ্ধার করা হবে, নাবিকদের কীভাবে মুক্তি দেওয়া হবে এসব বিষয় আসতে পারে।

পুরো প্রক্রিয়ায় একটু দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে উল্লেখ করে ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এসব কাজ সমন্বয় করতে সময় লাগবে। তবে কেএসআরএম যেহেতু আগে একবার এ ধরনের ঘটনা ফেইস করেছে, তাই এবার তাদের সময় কম লাগবে।’

জলদস্যুদের কাছ থেকে ফোন ও পরবর্তী প্রক্রিয়া কী হতে পারে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মাকসুদ আলম বলেন, ‘এখন আলোচনা ছাড়া কোনো পথ নেই। আলোচনার মাধ্যমেই জিম্মি নাবিকদের উদ্ধার করে নিয়ে আসতে হবে।’

যাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে তারা সঠিক মধ্যস্থতাকারী কি না তা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে কমডোর মাকসুদ কামাল বলেন, ‘আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। যেহেতু তারা ফোন করেছে, তাই তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। পরে সমস্যা হলে ওই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’

এর আগে অভিযান চালিয়ে জাহাজ ও নাবিক উদ্ধারের কথা বলা হলেও জাহাজের মালিকপক্ষ এবং সরকারের পক্ষ থেকে সম্মতি দেওয়া হয়নি। মূলত নাবিকদের অক্ষত উদ্ধারের জন্যই সশস্ত্র অভিযানে রাজি হয়নি মালিকপক্ষ। তাদের পুরো আস্থা রয়েছে, আলোচনার মাধ্যমেই জিম্মি নাবিক ও জাহাজকে উদ্ধার করা যাবে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার জাহাজটিতে ৮২ কোটি টাকার কয়লা রয়েছে। মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে জাহাজটি দুবাই যাচ্ছিল। এসব কয়লা পাওয়ার প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হওয়ার কথা বলে জানা গেছে।

গত ১২ মার্চ দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ভারত মহাসাগর থেকে জিম্মি করা হয় এমভি আবদুল্লাহ। জাহাজটিতে ৫৫ হাজার টন কয়লা রয়েছে। জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের গ্যারাকাদে নোঙর করে। গত শুক্রবার বিকেলে সেই পয়েন্ট থেকে উত্তর দিকে আরও সাড়ে ৭ কিলোমিটার সরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার আবার সরিয়ে উপকূলের কাছাকাছি নেওয়া হয়।

একই মালিক গ্রুপের এমভি জাহান মনিও একই গ্রুপের জলদস্যুরা জিম্মি করেছিল বলে তখনকার জিম্মি নাবিক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সেবারও মুক্তিপণ দিয়ে নাবিক ও জাহাজ উদ্ধার করা হয়। সোমালিয়ান জলদস্যুরা ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৮টি জাহাজ জিম্মি করেছিল। এর আগে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জিম্মি করেছিল ৩৫৮টি জাহাজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত