রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে একসময় তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান, প্রয়াত রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন রেলওয়েতে ‘কালো বিড়াল’ রয়েছে। অনেকেরই ধারণা, এর পরই নাকি ষড়যন্ত্র করে তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তই থামাতে পারেননি রেলওয়ের কালো বিড়ালকে। আজও সেই কালো বিড়ালের কারণে বরাবর লোকসানের মধ্যে রয়েছে রেলওয়ে। সাধারণ যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে চলা টিকিট ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। অনেক হাঁকডাক করে বলা হয়েছিল এখন থেকে ট্রেনের টিকিট পেতে যাত্রীদের আর কষ্ট করতে হবে না। সব অনলাইন করা হয়েছে। যাত্রীরা ঘরে বসেই টিকিট কাটতে পারবেন। শুধু তাই না, ‘টিকিট যার ভ্রমণ তার’ শীর্ষক স্লোগান ধারণ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) মাধ্যমে শুরু হয়েছিল রেলওয়ের টিকিট সংগ্রহ। তারপর? যথা পূর্বং তথা পরং (আগে যা ছিল পরেও তাই)! প্রায় সময় স্টেশন থেকে বলা হয়, ‘সার্ভার ডাউন’! আবার বিক্রির কয়েক মিনিট পরই জানা যায়, টিকিট শেষ! কিন্তু স্টেশনের আনাচে-কানাচে টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দালাল! নির্ধারিত মূল্যের ২-৩ গুণ বেশি দামে তারা টিকিট বিক্রি করেন। বিশেষ করে ঈদ-পূজা বা কোনো বিশেষ দিনে তাদের থাকে প্রচন্ড দাপট।
ট্রেনের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি ও তদারকির পরও থেমে নেই কালোবাজারি। নানা কৌশলে কালোবাজারির পাশাপাশি চলছে জাল টিকিট বিক্রি। এ ছাড়া বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়ার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কম, রেলওয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ এবং ট্রেনে খাবার সরবরাহের ক্যাটারিং কর্মীদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এর ফলে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। সারা বছর তো চলেই, তবে ঈদ কিংবা অন্য কোনো উৎসবের আগে বেড়ে যায় এই সিন্ডিকেট সদস্যদের দৌরাত্ম্য। শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘কারসাজিতে সহজ ও রেল কর্মচারীদের সিন্ডিকেট’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পর কালোবাজারি কমবে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং নতুন নতুন কৌশলে টিকিট সংগ্রহ করে যাত্রীদের কাছে চড়া দামে তা বিক্রি করছে কালোবাজারি সিন্ডিকেট।
ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদ কিংবা বিভিন্ন উৎসবে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত কিংবা তারও বেশি সময় ধরে সার্ভারে ঢোকা যায় না। আবার সার্ভারে ঢোকার পর দেখা যায় সব টিকিট বিক্রি শেষ। এ ক্ষেত্রে টিকিট বিক্রির সার্ভারটি ইচ্ছে করে ডাউন করে রাখা হয়। পাশাপাশি সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিভিন্ন গন্তব্যের টিকিট সংগ্রহ করে পরে তা স্টেশনে, ফেসবুকের মাধ্যমে কিংবা নানা মাধ্যমে যাত্রীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে। এর সঙ্গে কোন পক্ষ জড়িত? ইতিমধ্যে অনলাইন টিকিটিংয়ের দায়িত্বে থাকা সহজ.কমের ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে। এছাড়া আরও ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছে। এরা টিকিট ‘কালোবাজারি সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। অনলাইনে টিকিটের সব ব্যবস্থা থাকার পরও, এই অব্যবস্থা কীভাবে হচ্ছে সেটাই বড় ধরনের প্রশ্ন। সহজ.কমের সার্ভার অপারেটর, পিয়ন এবং আরও কয়েকজন বিভিন্ন কালোবাজারিকে তথ্য দিয়ে কীভাবে সহযোগিতা করছেন যদি এর সঙ্গে রেলওয়ের ‘বোয়াল’রা যুক্ত না থাকে? এর সঙ্গে যারা জড়িয়ে রয়েছে, তাদের পরিণতি কী হবে? এইভাবে কতদিন খুঁড়িয়ে চলবে রেলওয়ে? জয় হবে রেল সিন্ডিকেটের! উত্তর অজানা।
