সমিতির খপ্পরে নিঃস্ব মানুষ!

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৪, ০১:৩৬ এএম

তীলে তীলে সমবায় সমিতিতে ১ লাখ ৭৫০ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন খুলনার ডুমুরিয়া বাজারের ক্ষুদ্রব্যবসায়ী মো. রিপন শেখ। কিন্তু হঠাৎ তার সঞ্চিত টাকা নিয়ে উধাও হয় নবজাগরণ সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির কর্তৃপক্ষ। থানায় অভিযোগ দিয়েও টাকা ফেরত পাননি এই ব্যবসায়ী। একইভাবে এই সমিতিতে সঞ্চিত টাকা খুইয়েছেন বাজারটির আরও অন্তত ২০ জন ক্ষুদ্রব্যবসায়ী।

শুধু নবজাগরণ সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিই নয়; গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হচ্ছে অনেক সমিতি। এতে দরিদ্র মানুষ সমবায় সমিতির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার বদলে নিঃস্ব হচ্ছে। ভাঙছে তাদের স্বপ্ন।

খুলনা জেলা সমবায় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা জেলায় নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ১ হাজার ৭৭১টি। তবে গত পাঁচ অর্থবছরে নিবন্ধন পেয়েছে ৪১২টি সমিতি। এ সময়ে বাতিল হয়েছে ৭৭৭টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে নিবন্ধন পায় ৯৫টি, বাতিল হয় ৫৫টি সমিতির নিবন্ধন। ২০২০-২১ অর্থবছরে নিবন্ধন পায় ১০৭টি সমিতি, বাতিল হয় ৮৪টির। ২০২১-২২ অর্থবছরে নিবন্ধন পায় ৪৭টি, বাতিল হয় ২৪৫টি সমিতির নিবন্ধন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নিবন্ধন পায় ১১৬টি সমবায় সমিতি, বাতিল হয় ২৮২টির। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিবন্ধন পায় ৪৭টি, বাতিল হয় ১১১টি সমিতি। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে নিবন্ধন পাওয়া সমবায় সমিতির চেয়ে বাতিল হওয়া সমবায় সমিতির সংখ্যা অনেক বেশি।

মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য হাজিডাঙ্গা আলোকিত সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেডে এককালীন ও মাসিক ৭০০ টাকা কিস্তিতে দেড় বছরে সাড়ে ৬ লাখ টাকা সঞ্চয় করেন কৃষক শিশির ম-ল। তিনি জানান, সমিতির প্রতিশ্রুতি ছিল সাত বছরে মুনাফাসহ দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু মাঝপথে সমিতিটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে। সেইসঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে তার স্বপ্নও।

একই সমিতির গ্রাহক জ্ঞানো বিশ্বাস ও মিঠুন জোয়াদ্দার জানান, সমিতির নিবন্ধন দেখে আর্থিক লেনদেন করেছেন তারা। অথচ লেনদেনের একপর্যায়ে তাদের মতো গ্রাহকের অন্তত ৪ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে তারা। তারা কেউই আর টাকা ফেরত পাননি।

গ্রাহকের টাকা নিয়ে সমবায় সমিতির লাপাত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা জেলা সমবায় কর্মকর্তা সৈয়দ জসীম উদ্দিন বলেন, গ্রাহকরা অভিযোগ দিলে এ ক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনেক সময় গ্রাহকরা মামলাও করেন।

সমিতির নিবন্ধন বাতিল সম্পর্কে তিনি বলেন, অনেকে কৃষি ও মৎস্য বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রকল্প নেওয়ার জন্য সমবায় সমিতির নিবন্ধন নেয়। প্রকল্প শেষ হলে তারা আর সমিতি চালাতে চায় না। এ ছাড়া সমিতির নীতিমালা বা আইনের ব্যত্যয় ঘটলে যেমন-কার্যক্রম নিষ্ক্রিয় হলে, অফিস না থাকলে, অডিট-বার্ষিক সাধারণ সভা বন্ধ হয়ে গেলেও নিবন্ধন বাতিল করা হয়।

সমবায় সমিতিগুলো মনিটরিংয়ের বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘যে জনবল আছে, সেই জনবল নিয়ে যতটুকু সম্ভব সেইটুকু করার চেষ্টা করি।’

গ্রাহকের সঞ্চয় নিয়ে সমবায় সমিতির লাপাত্তা হওয়ার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্র্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমবায় কার্যালয়ের অসতর্কতার কারণে এসব হচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষ সমবায় সমিতির খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। তাই সমস্যা উত্তরণে নিবন্ধন দেওয়ার পর সমবায় কার্যালয়কে সঠিকভাবে মনিটরিং করতে হবে। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট থানাকেও তদারকি বাড়াতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত