রমজান মাস সহমর্মিতার মাস, ক্ষুধার্তদের জঠরজ্বালা উপলব্ধির মাস, গরিব-দুঃখীর দুঃখ দূরীকরণে এগিয়ে আসার মাস। রমজান মাস নিঃস্ব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাস। আর রোজার অন্যতম আমল হলো দান-সদকা করা। গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এ মাসে বান্দা যত আমল করবে, তার আমলনামা ততই সমৃদ্ধ হবে। দানে সম্পদ বাড়ে। রমজানে দানের ফজিলত অনেক বেশি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মাহে রমজানে অধিকহারে দান করতেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমজানে তার দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। (সহিহ মুসলিম : ৬১৪৯)
নবী করিম (সা.) নিজে দান করে উম্মতদের শিক্ষা দিয়েছেন রমজান মাসে দান ও বদান্যতার হাত সম্প্রসারিত করতে। কারণ রমজান মুমিনের আমলের বসন্তকাল। দানের ফজিলত প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দান করলে মানুষের সম্পদ কমে না বরং সম্পদ আরও বাড়ে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্য দান-সদকা করো, তাহলে তা কতই না উত্তম। আর যদি তা গোপনে গরিব ও অভাবীদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’
রমজানের রোজা ফরজ করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো গরিব-দুঃখী মানুষের কষ্ট অনুভব করা। যারা প্রাচুর্যের মধ্যে জীবনযাপন করেন, তারা সারা বছর ক্ষুধা ও পিপাসার যন্ত্রণা না বুঝলেও অন্তত রমজানে কিছুটা অনুভব করেন। রমজান মাসে আল্লাহতায়ালা প্রতিটি নফল কাজের সওয়াব ৭০ গুণ বাড়িয়ে দেন। সে হিসাবে রমজানে এক টাকা দান করলে ৭০ টাকা দানের সওয়াব লাভ হবে। এজন্য আমাদের রমজানে বেশি বেশি দান-সদকা করা উচিত।
দানের ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দানদাতার ইহকালীন ও পরকালীন সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি করে, তাই তা সযত্নে প্রদান করা। সম্পদ ব্যয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ খাত বাবা-মা। বাবা-মা ও ছেলেমেয়ে ছাড়া অন্যসব আত্মীয়স্বজনকে ফেতরা ও জাকাত দেওয়া যায়। আত্মীয়দের মধ্যে ভাইবোনের হক সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ি ও বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয় যারা, তাদেরও অগ্রাধিকার রয়েছে। রমজানে, ঈদে, কোরবানি ও নানা উপলক্ষে তাদের হাদিয়া দেওয়া সুন্নত। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা দয়াদাক্ষিণ্য ও করুণা গ্রহণে কুণ্ঠাবোধ করেন, তাই তাদের উপহার-উপঢৌকন হিসেবে দেওয়াই সমীচীন। এটাই দানের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। জাকাত-ফেতরা উল্লেখ না করেও দেওয়া যায়; যাতে গ্রহীতা বিব্রত না হন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা দান প্রকাশ্যে করো তবে তা উত্তম, আর যদি তা গোপনে করো এবং অভাবীদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য শ্রেয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের মন্দগুলো মোচন করে দেবেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা অবগত আছেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭১)
ইসলামের শিক্ষা হলো দান করে খোঁটা দিতে নেই। এতে দানের ফজিলত বিনষ্ট হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সদ্ব্যবহার, সুন্দর কথা ওই দান অপেক্ষা উত্তম, যার পেছনে আসে যন্ত্রণা। আল্লাহতায়ালা ঐশ্বর্যশালী ও পরমসহিষ্ণু। হে মুমিনরা! তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বাতিল করো না তাদের মতো, যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে লোকদেখানোর জন্য এবং তারা আল্লাহ ও পরকাল বিশ্বাস করে না।’ (সুরা বাকারা : ২৬৩-২৬৪)
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘খোঁটাদানকারী বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (জামে তিরমিজি) আল্লাহতায়ালা সবাইকে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সহযোগিতার এ মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করে গরিব-অসহায়, নিঃস্ব লোকদের পাশে দাঁড়িয়ে অশেষ সওয়াব অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা
