ছুটি না বাড়ালে বাড়ি যেতে হতে পারে ঈদের দিন

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ১২:১৮ পিএম

রমজানের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ঈদের আমেজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে ঈদের ছুটি শুরুও হয়ে গেছে। এখন ছুটির হিসাব কষছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৯ রোজা হলে এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপন হবে ১০ এপ্রিল বুধবার। আর যদি তাই হয়, ছুটির প্রথম দিন যারা বাড়ির পথে ছুটবেন তাদের ঈদের নামাজ পড়তে হতে পারে যাত্রাপথেই। কারণ সরকার যে ছুটি ঘোষণা করেছে সেই বর্ষপঞ্জি অনুসারে ঈদের ছুটি শুরু ১০ এপ্রিল থেকে। ৯ এপ্রিল মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস করতে হবে। আর সরকারি ছুটি অনুসরণ করায় বেসরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। ছুটির বর্ষপঞ্জি বিশ্লেষণ করে এমন চিত্রই মিলছে।

২০২৪ সালের ছুটির যে তালিকা তাতে ঈদুল ফিতরের ছুটি ১০ থেকে ১২ এপ্রিল। ১০ এপ্রিল বুধবার, ১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ও ১২ এপ্রিল শুক্রবার। ১৩ এপ্রিল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। তার পরদিন ১৪ এপ্রিল রবিবার বাংলা নববর্ষের ছুটি। এসব মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া গেলেও ছুটি বিড়ম্বনার শেষ হচ্ছে না।

সরকার সাধারণত ২৯ রোজা ধরেই বর্ষপঞ্জি তৈরি করে। চাঁদের কারণে ২৯ রোজা শেষে ঈদ না হলে সরকার নির্বাহী আদেশে এক দিন ছুটি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এবার ৩০ রোজা ধরেই বর্ষপঞ্জি করা হয়েছে। এ কারণে বর্ষপঞ্জিতে ঈদের সম্ভাব্য তারিখ দেখানো হচ্ছে ১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার।

বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। তারা ৯ এপ্রিল পর্যন্ত অফিস ধরে ১০ এপ্রিলের টিকিট কাটতে চান। কিন্তু ২৯ রোজা হলে ১০ এপ্রিলেই ঈদ হবে। চাকরিজীবীদের রাস্তায় ঈদের নামাজ পড়তে হবে। একই সংকট বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও।

ছুটির বিষয়টি কেন তালগোল পাকালো জানতে চাইলে জনপ্রশাসনের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘বিষয়টি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল, তাই অনেক সময়ই পরিকল্পনামতো হয় না। কয়েক ঘণ্টা আগে চাঁদ দেখা গেলেই তারিখ বদলে যায়। এবারও অনেকটা ওরকমই হয়ে থাকতে পারে। যাই হোক, বিষয়টি নিয়ে ওপর মহলে আলোচনা আছে। সমাধান হতে পারে। কিন্তু সমাধান করতে গিয়ে দীর্ঘ ছুটির ফাঁদে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

দীর্ঘ ছুটির ফাঁদে কীভাবে পড়তে পারে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘১০ এপ্রিল বুধবার ঈদ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে দূরে থাকতে হলে ৯ এপ্রিল মঙ্গলবার ছুটি দিতে হবে। ওই সপ্তাহে মাঝখানে কর্মদিবস থাকে শুধু ৮ এপ্রিল সোমবার। এ দিনটিকেও ছুটি দিলে ১০ দিনের লম্বা ছুটি হয়ে যায়। কারণ ৭ এপ্রিল পবিত্র শবেকদরের ছুটি। তার আগের দুদিন ৫ এপ্রিল শুক্র ও ৬ এপ্রিল শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। এ ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১৪ এপ্রিল ১০ দিনের ছুটি পড়ে যাচ্ছে। তাই বাড়তি ছুটির বিষয়টি উপেক্ষা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী নির্দেশনা আসে।’

এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি দুদিনের ছুটি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, ঈদে ঢাকা ও ঢাকার পাশের দুই শিল্প জেলা গাজীপুর ও নরসিংদী থেকে ঈদে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে। ঈদের আগের দিন সব মানুষ একসঙ্গে এসব শহর থেকে বের হলে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তাই দুর্ভোগ এড়ানোর জন্য অতিরিক্ত দুদিনের ছুটি দাবি করেছে সংগঠনটি।

ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে দুর্ভোগের বিষয়টি নতুন নয়। এ দুর্ভোগের প্রচার দেশের সীমা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। এ দেশের মানুষের বাদুড়ঝোলা হয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদে করতে যাওয়ার দৃশ্য ধারণ করতে বিশ্বের খ্যাতনামা গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ঢাকায় ভিড় করেন। এ দেশের ফটোসাংবাদিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে তারা এ সংক্রান্ত ছবি তোলেন। প্রতিটি ঈদে এসব দুর্ভোগের ছবি ছাপা হলেও সমাধান হয় না। ঈদের ছুটিটা একটু প্রলম্বিত করে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ কমানোর উদ্যোগ নানা সময়ে নেওয়া হলেও তা আটকে দেওয়ার লোকের অভাব হয় না। ২০১৭ সালে একবার ঈদের ছুটি বাড়ানোর প্রস্তাব উঠেছিল, তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছিল, শুধু ঈদের ছুটি বাড়ানো নয়, অন্যান্য প্রধান ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসবের ছুটিও বাড়ানো দরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই অভিমত পাওয়ার পর বিষয়টি ইতিবাচক ধরে নিয়েই সংশোধিত প্রস্তাব পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। প্রস্তাবটি আর আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি প্রস্তাবটি আর ফেরত আসেনি জনপ্রশাসনে। এমনটাই জানিয়েছেন একজন মধ্যসারির কর্মকর্তা।

এরপর একাধিকবার মন্ত্রিসভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো কখনো ছুটি বাড়ানোও হয়েছে। কিন্তু ওইসব ছুটি বাড়ানো হয় শুধু ওই বছরের ঈদের জন্য। সামগ্রিকভাবে ছুটি বাড়িয়ে ঈদে বা অন্যান্য উৎসবে সাধারণ মানুষকে প্রিয়জনের সঙ্গে মনমতো উৎসব করার সুযোগ করে দেওয়া হয় না। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করার জন্য নগরবাসী ঘর থেকে ঘড়ি ধরে বের হলেও ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। যানজটে আটকা পড়ে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। চাতক পাখির মতো তারা অপেক্ষায় থাকেন কখন গাড়িটি একটু এগোবে। শামুকের মতো চলতে হওয়ায় অনেককে পথেই ঈদ করতে হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১২তম গ্রেডের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সচরাচর ঈদের ছুটি থাকে মাত্র তিন দিনের। এ সময়টা আসা-যাওয়ার পথেই কেটে যায়। উৎসব করার আর সুযোগ কই? অথচ বছরে সরকারি ছুটি কম নয়। ২০২৪ সালে ১৪ দিন সাধারণ ছুটি এবং নির্বাহী আদেশে আট দিন সরকারি ছুটি মিলিয়ে মোট ২২ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব ছুটি কমিয়ে অনায়াসে ঈদের ছুটি বাড়ানো যায়। বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্মীয় বা জাতীয় উৎসবে দীর্ঘ ছুটির রেওয়াজ রয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশে নেই। ঈদের সময় পথের যন্ত্রণা ভোগ করে বাড়ি পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ফেরার সময় এসে যায়। অথচ বছরের অন্য সময়ের ছুটির সঙ্গে ঈদের ছুটি সমন্বয় করা হলে এর একটা সুরাহা হয়। কিন্তু এ সমন্বয় করার দায়িত্বটাই কেউ নিতে চায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত