সক্ষমতার ২০ গুণ যাত্রী রেলে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে মানুষের পছন্দের বাহন ট্রেন। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েই রেলওয়ের সক্ষমতার চেয়ে যাত্রীর চাহিদা অন্তত ৮ থেকে ১০ গুণ। বিভিন্ন উৎসবে বিশেষ করে ঈদের সময় এই চাহিদা বেড়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ গুণে দাঁড়ায়। চাহিদামতো টিকিট না পেয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অন্যদিকে আয় কম হওয়ায় রেল লোকসান গুনছে প্রতিবছর।

রেলওয়ে সূত্রমতে, ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে রেল উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২৪৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে রেলের উন্নয়ন বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে এখন তা ১৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সব মিলে গত ১৪ বছরে রেলের উন্নয়নে বরাদ্দ ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলে বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হলেও এ খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা মূলত নতুন রেললাইন নির্মাণ ও সংস্কার, স্টেশনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে। সে তুলনায় ইঞ্জিন ও বগি কেনা হয়েছে অনেক কম। যাত্রী পরিবহন সক্ষমতার বিষয়ে অবহেলায় থাকার কারণেই চাহিদা এবং সক্ষমতার বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি নতুন রেললাইন নির্মাণ হলেও রেলের গতি বাড়েনি। এর সঙ্গে জনবল সংকট তো রয়েছেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলের ইঞ্জিন ও কোচ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর জনবল ও গতি বৃদ্ধি করা গেলে যাত্রীদের দুর্ভোগ যেমন কমত, রেলের আয়ও বাড়ত। রেলওয়ের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়েতে যাত্রীবাহী কোচ ছিল ১ হাজার ৬৪৩টি। দীর্ঘ ৫২ বছর পর রেলের যাত্রীবাহী কোচসংখ্যা বেড়ে হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮০০-এর মতো। যার প্রায় অর্ধেকেরই স্বাভাবিক আয়ু শেষ। এই কোচ দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ৩১০ থেকে ৩২০টি ট্রেন চলাচল করে সারা দেশে। রেলের অন্তত ৬০ শতাংশই মেয়াদ শেষ। অথচ রেলের সব কটি ট্রেন নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে হলে দরকার ৩ হাজারের বেশি কোচ আর প্রায় ৫০০ ইঞ্জিন।

গত বছর সারা দেশে ৭ কোটি ৩৫ লাখ যাত্রী পরিবহন করে রেলের আয় হয়েছে ১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ২ লাখের মতো যাত্রী পরিবহন করছে রেলওয়ে।

চাহিদার তুলনায় ট্রেনে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা অনেক কম তা স্বীকার করে গত বুধবার রেলমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা ২০০ বগি আমদানির অনুমোদন পেয়েছি। আগামী এক বছরে ৭০০-৮০০ বগি এবং ইঞ্জিন আমদানি করব। আশা করি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আরও বেশি যাত্রী ও মালামাল বহন করাতে পারব।’

নতুন নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হলেও এসব লাইনে পর্যাপ্তসংখ্যক ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে বিদ্যমান ট্রেনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী কোচ দেওয়া যাচ্ছে না। এক লাইনের ইঞ্জিন, বগি অন্য লাইনে দিয়ে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে রেল। এমনকি গরিবের ট্রেন বলে পরিচিত অনেক লোকাল ও কমিউটার ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রেলের ৪৭ হাজার ৬৩৭টি পদের বিপরীতে জনবল রয়েছে মাত্র ২৪ হাজার ৫০০ জন। ট্রেন চালানোর কাজে নিয়োজিত জনবলের চাহিদার বিপরীতে রয়েছে মাত্র ৩৮ শতাংশ।

রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের যে চাহিদা, তাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৪ লাখ টিকিট শুধু ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার জন্য দরকার। কিন্তু রেলের আন্তঃনগর ট্রেনের ৩০ হাজারের কিছু বেশি টিকিট প্রতিদিন বিক্রি করা হয়। মেইল, লোকাল ও অন্যান্য ট্রেন মিলে সারা দেশে দেড় লাখ টিকিট বিক্রির জন্য নির্ধারিত আছে।

অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে দাঁড়িয়ে যাতায়াতের জন্য নন-এসি শ্রেণির বগির আসনসংখ্যার ২৫ শতাংশ বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে। এরপরও আরও অতিরিক্ত অসংখ্য যাত্রী গাদাগাদি করে, ট্রেনের ছাদে ঝুঁকি নিয়ে ছুটছে বিভিন্ন গন্তব্যে।

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার ঈদের আগাম টিকিট বিক্রি শুরুর পর একটি টিকিটের জন্য গড়ে অনলাইনে ৬০০ বার চেষ্টা করেছে মানুষ। একজন ব্যক্তি যদি ১০ বার চেষ্টা করেন তাও একটি টিকিটের জন্য ৬০ জন চেষ্টা করেছেন। অবশ্য একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। সেই বিবেচনায় নিলে সংখ্যাটি আরও বাড়বে। প্রতিদিন টিকিটের জন্য গড়ে আড়াই থেকে তিন কোটিবার অনলাইনে চেষ্টা (হিট) করা হয়েছে।

ঈদের সময় ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের পা রাখার জায়গাটুকুও থাকার অবস্থা থাকে না। অনেক যাত্রী টিকিট কাটার পরও প্রচন্ড ভিড়ের কারণে তার আসন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। দুই বগির মধ্যে ফাঁকা স্থান, নামাজের জায়গা, কেনটিনসহ সবখানে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়।

এ বছর ঈদের টিকিট বিক্রির ঝামেলা কমাতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কারণে টিকিট কালোবাজারি অনেক কমে এসেছে। কিন্তু ট্রেনের আসনসংখ্যা সে তুলনায় বাড়েনি।

গত বছরের এপ্রিলে ঈদযাত্রায় ট্রেনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭৫ হাজার যাত্রী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। ওই সময় আন্তঃনগর ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার আসনের টিকিট বিক্রি করা হয়। ওই বছরের ১৯ এপ্রিল ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) কামরুল আহসান বলেছিলেন, আগামী ঈদে (এবারের ঈদুল ফিতরে) ট্রেনে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা দেড় গুণ বাড়ানো হবে। কিন্তু এ বছর মাত্র সাড়ে ৩ হাজার আসন বাড়ানো হয়েছে ঈদ উপলক্ষে।

এবার ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোয় ঈদ স্পেশালসহ প্রতিদিনের বরাদ্দ ৩৩ হাজার ৫০০ টিকিট। অথচ রেলের বাণিজ্য বিভাগ বলছে, ঈদযাত্রায় প্রতিদিন ঢাকা ছাড়বে রেলপথে অন্তত দেড় লাখ মানুষ। আর শেষের দু-তিন দিনে ঢাকা ছাড়বে গড়ে দুই লাখেরও বেশি যাত্রী।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেলওয়ের কর্মকর্তারা কেনাকাটায় বেশি ব্যস্ত। রানিং স্টাফরা অবৈধ উপায়ে নিজেদের পকেট ভরায় মগ্ন। যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে মনোযোগ কম হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ভ্রমণের বাহন হিসেবে এখনো ট্রেনই শীর্ষে।

তিনি বলেন, রেলে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। আধুনিক রেলব্যবস্থায় স্টেশনগুলোর সঙ্গে যাত্রীদের বিভিন্ন স্থান থেকে আসার জন্য সমন্বিত যাতায়াত ব্যবস্থা থাকা দরকার যেটি দেশে নেই। আবার দুর্বল লাইন ও ইঞ্জিন এবং অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে ধীর গতি ট্রেন চলে। ফলে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যায় না। তা ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে যত বেশি ব্যয় হয়েছে, যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে তত বেশি অবহেলা করা হয়েছে।

তার মতে, সারা দেশে ৯০ শতাংশ মানুষ সড়কপথে যোগাযোগ করে। সুতরাং রেলে বিপুল পরিমাণ যাত্রী চাহিদা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে সক্ষমতার চেয়ে অন্তত ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি চাহিদা রয়েছে। ঈদ উৎসবে তা বেড়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ গুণ হয়। রেলের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে রেল ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও অনিয়ম-দুর্নীতি মুক্ত হতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত