ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবারও দূরপাল্লার বেশিরভাগ বাসে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। যাত্রীরা বলছেন, কয়েকটি পরিবহনে ভাড়া বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক বাসে অর্ধেক যাত্রায়ও সংশ্লিষ্ট রুটের শেষ গন্তব্যের টিকিটের মূল্য পরিশোধে বাধ্য করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে বাস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।
সরেজমিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, টিকিট ও বাসের জন্য টার্মিনালগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা। অধিকাংশ বাসে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। একাধিক যাত্রীর ভাষ্য, বিশৃঙ্খল পরিবেশে পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা একপ্রকার জিম্মি করে ভাড়া বাড়িয়েছেন। দিন যত যাবে এমন বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে থাকবে। সব মিলিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষকে পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। যাত্রীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ধারণা, এবারের ঈদে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে সড়কপথে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করবে।
গাবতলী বাস টার্মিনালে রেজওয়ান নামে এক যাত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায়। বাড়ি যাওয়ার জন্য আগেভাগেই আসলাম ঈদের টিকিট কাটতে। কিন্তু এসে তো পুরো বিপদে পড়ে গেলাম; টিকিট নামের সোনার হরিণ পাওয়াই যাচ্ছে না! আর পেলেও নির্ধারিত ভাড়া থেকে দুই গুণ বেশি দামে চাচ্ছে।’
এই টার্মিনালে আরেক যাত্রী ইমতিয়াজ বলেন, ‘ঈদ এলেই বাড়তি ভাড়ার বোঝা নিতে হয় যাত্রীদের। এ নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। কয়েক সপ্তাহ আগেও গাইবান্ধার এসি বাস সার্ভিস ওরিন পরিবহনে যে টিকিট এক হাজার টাকা ছিল; সে টিকিট এখন দুই হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য পরিবহনেরও একই অবস্থা। আর ঈদ সামনে রেখে নন-এসি বাসের ভাড়াও বাড়তি রাখছে। ইউনিটি ও ওরিনের নন-এসির ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার টিকিট এখন ১৫০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।’
বাড়তি ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে গাবতলী বাস টার্মিনালে ওরিন পরিবহনের এক টিকিট বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা গাড়ি যখন ঢাকার বাইরে যায়, সেই গাড়ি তিনজন যাত্রী হলে ঢাকায় ফিরে। তখন আমাদের ব্যয় বেড়ে যায়। সেই ব্যয় পূরণ করতে কিছু সময় ভাড়া বেশি নেওয়া হয়। এর বেশি কিছু আর বলতে পারব না।’
এদিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে মেহনাজ নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি সিলেটে। ঈদে গ্রামে যাওয়ার জন্য আগেভাগেই এলাম। কিন্তু কোনো বাসই নির্ধারিত ভাড়ায় যেতে চাচ্ছে না। আগের থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া চাচ্ছে।’
ঈদ সামনে রেখে দূরপাল্লার পরিবহনগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে বলে দাবি করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ¦ালানি তেলের মূল্য কমিয়ে সরকার যখন বাসভাড়া কমানোর চেষ্টা করছে, এমন সময় কমানো ভাড়া কার্যকর করার পরিবর্তে পবিত্র ঈদুল ফিতরের যাতায়াতে দেশের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নামে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। সরকার প্রতিবছর ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যকারী গণপরিবহনগুলোকে কাগুজে বাঘের মতো হুঁশিয়ারি দিলেও কার্যকর অর্থে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে এবারের ঈদের অনলাইন টিকিটে বিভিন্ন রুটে বিভিন্ন শ্রেণির পরিবহন কোম্পানিগুলো প্রকাশ্যে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও তাদের বিরুদ্ধে অতীতের মতো কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সেই সঙ্গে টার্মিনালগুলোতেও এখন অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। দেড় থেকে দুই গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে ঈদযাত্রায়। সরকারের উচিত এই বিষয়গুলো দ্রুত মনিটরিং করা। তা না হলে সামনে আরও ভাড়া বাড়বে।’
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সমিতি থেকে নির্দেশনা দেওয়া আছে বাস মালিকদের কেউ যেন নির্ধারিত ভাড়ার থেকে বেশি না নেয়। তা ছাড়া সমিতি থেকে সব টার্মিনালে টিম পাঠানো হয়েছে। বেশি ভাড়ার অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’