মধ্যবিত্তের বিলাসী বিকল্প বিমান

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৬ এএম

সাকিব অর্ণবের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাবেন ৮ এপ্রিল। বিমানের টিকিট কিনতে গেলে দাম শুনে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ৭ হাজার টাকার টিকিটের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা। যানজট এড়াতে ও দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে একটি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনেন তিনি। তার মতোই জুলহাস নামের এক চাকরিজীবী যশোরে যাওয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা দামের টিকিট কেনেন ৯ হাজার টাকায়। তাদের মতোই এখন বিমানের টিকিট চড়াদামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা। বেশি দাম দিয়েও কেউ কেউ টিকিট পাচ্ছেন না। বিমানের টিকিটেরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সিন্ডিকেটের দখলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিমানযাত্রীরা সাধারণত ধনিক শ্রেণির ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির হলেও এখন মধ্যবিত্তও কাজের কারণে বা জরুরি প্রয়োজনে বাহন হিসেবে প্রায়ই উড়োজাহাজ ব্যবহার করে। এটা তাদের নিত্য পরিবহন নয়; কাজের বা জরুরি প্রয়োজনের ‘বিলাসী’ বাহন। আয়েশ করে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক ও রেলপথের চাপ পড়ছে আকাশপথে। যানজট এড়িয়ে সহজে নির্দিষ্ট স্থানে যেতে আকাশপথকেই বেছে নিচ্ছেন যাত্রীরা। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের টিকিট এখন বিক্রি হচ্ছে প্রচুর। ২৬ রমজানের পরের টিকিট এখন আর মিলছে না। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে টিকিট। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ প্রায় সব বিমান সংস্থার টিকিটের এখন আকাল। যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে তারা বাড়তি ফ্লাইট চালু করেছে। তারপরও টিকিটের আকাল।

বিমান সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই আপনজনদের সঙ্গে আনন্দ করতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে লোকজন। সড়ক, রেল ও নৌপথে বিড়ম্বনা হবে ধরে নিয়ে তা এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণের জন্য আকাশপথকে বেছে নিচ্ছে অনেক মানুষ। এবার পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উড়োজাহাজের ৯০ শতাংশ টিকিট ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তবে যেসব টিকিট এখনো অবিক্রীত, সেগুলো পাওয়ার জন্য ক্রেতাদের দাম দিতে হচ্ছে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। ২৬ রমজানের পরের টিকিটের চাহিদা বেশি।

তারা জানায়, অধিকাংশ টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। বাকি টিকিটগুলোর জন্য সাধারণ সময়ের চেয়ে বেশি দাম দিতে হবে। ৯ এপ্রিলের টিকিটের চাহিদা সর্বাধিক। এয়ার আস্ট্রা, নভোএয়ার, বিমান বাংলাদেশ ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের টিকিটের দাম বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, অনলাইনের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে বলে দেখানো হয়। অন্যভাবে টিকিট কাটার চেষ্টা করলেও দাম স্বাভাবিক, অন্য সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তারপরও অনেকে টিকিট কিনছেন।

সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে সরকারি-বেসরকারি চারটি এয়ারলাইনস। অভ্যন্তরীণ রুটগুলো হলো ঢাকা-সৈয়দপুর, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-যশোর, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-বরিশাল। অভ্যন্তরীণ রুটের মধ্যে কক্সবাজার ছাড়া অন্য রুটের ভাড়া সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৪০০, সর্বোচ্চ প্রায় ১০ হাজার টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ২৮ রমজানের কোনো টিকিট নেই।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২৫ রমজানের পরের ৭০ শতাংশের বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। বিভিন্ন দামের টিকিট থাকে। যারা আগে টিকিট কেটেছেন তারা কম দামের টিকিট নিয়েছেন। এখন টিকিট কাটলে দাম বেশি পড়বে। ঈদের সময় ঢাকা থেকে যাত্রীভর্তি ফ্লাইট গেলেও ফিরবে ফাঁকা হয়ে। ভাড়া নির্ধারণে তাই ফিরতি ফ্লাইটের হিসাবটাও থাকে। পৃথিবীর সর্বত্র একই পদ্ধতিতে আকাশপথের টিকিট বিক্রি হয়। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ ছাড়ের চেষ্টা করি। যাত্রীর চাপ থাকায় ফ্লাইট বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে।’

একই কথা বলেছেন নভোএয়ারের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সৈয়দপুর ও রাজশাহীর মতো রুটে টিকিটের চাহিদা বেশি। এবার অন্যান্য বছরের চেয়ে ছুটিও লম্বা। ঈদের চার-পাঁচ দিন আগের ও পরের ৯০ শতাংশ টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এখনো যা অবিক্রীত রয়েছে, সেগুলো পেতে দাম দিতে হবে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। আমাদেরও ফ্লাইট বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।’

এয়ারলাইনসগুলো বলছে, যাত্রীদের চাপের মুখে ঈদের আগে আগে বাড়তি ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ মেলে। এবারও সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস বলছে, তারা প্রতিদিন অভ্যন্তরীণ রুটের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার ৩০টি ও ফেরার ৩০টি মোট ৬০টি ফ্লাইট পরিচালনা করে। তাদের ২৫ রোজা থেকে ঈদের দিন পর্যন্ত ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। ঢাকায় ফেরার টিকিটও বিক্রি হয়ে গেছে।

নভোএয়ার বলছে, তারা ৩০টি ফ্লাইট পরিচালনা করে। এয়ার আস্ট্রা বলছে, তারা প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যে ২৪ থেকে ২৬টি ফ্লাইট পরিচালনা করে। তাদের টিকিটও শেষ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিটেরও চাহিদা আছে। তাদের টিকিটও প্রায় সব বিক্রি হয়ে গেছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যাত্রীদের সুবিধা ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট বাড়ানো হচ্ছে। এসব রুটে অতিরিক্ত ৯টি (যাওয়া-আসা মিলে ১৮টি) ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান।’

তিনি বলেন, ‘৪ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের অতিরিক্ত ফ্লাইট চলবে। সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর ও বরিশাল রুটে এসব অতিরিক্ত ফ্লাইট চলবে। সিলেট ও চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা বিমানের নিয়মিত ফ্লাইটের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে পারবে। আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট বাড়ানো হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত