পুরনো দ্বৈত অর্থনীতি দেখা যাচ্ছে

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৩১ এএম

পাকিস্তান আমলে দ্বৈত অর্থনীতি চালু ছিল এবং মুক্তিযোদ্ধারা একটি দেশের জন্য ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তবে দেশে আয়বৈষম্য ও বৈষম্য এখন এমনভাবে বেড়েছে যে, মনে হচ্ছে দ্বৈত অর্থনীতি আছে এবং এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গতকাল রবিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত প্রাক বাজেট আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

দেশে এখন পুরনো দ্বৈত অর্থনীতি দেখা যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বেকার মানুষের হার বাড়ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শতাংশ নবীন স্নাতক বেকার। তিনি সরকারকে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর পরামর্শ দেন যাতে ধনী ব্যক্তিরা বেশি করে দেয় এবং নিম্ন আয়ের লোকদের করের অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে না হয়।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, কভিডের সময়ে আয়করের সর্বোচ্চ হার একটি কঠিন সময়ের বিবেচনায় ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল, কিন্তু কভিড শেষ হয়ে গেলেও হার আগের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে ফিরিয়ে আনা হয়নি। সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আসন্ন জাতীয় বাজেটে আবারও এ জাতীয় প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং পরবর্তী বাজেট’ শীর্ষক এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উচ্চপ্রবৃদ্ধি ও নিম্ন মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি বেশ স্থিতিশীল ছিল। এ অবস্থা থেকে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হলো, প্রবৃদ্ধি স্তিমিত এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিকে কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রায় ১৮ মাস দুই অঙ্কের কাছাকাছি রয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হবে যে কীভাবে একটি ভালো অর্থনীতি মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিতে পরিণত হলো।

তিনি বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের ভুল নীতি গ্রহণের ফল এখনো ভোগ করছে জনগণ। ওই অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম দুই থেকে আড়াইগুণ বেড়ে গেল। এমন পরিস্থিতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশ, ব্যালান্স অব পেমেন্টে সমস্যা বুঝতে না পারা, মূল্যস্ফীতি নিম্ন পর্যায়ে ধরে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েই বাজেট দেওয়া হলো। সুদহারের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিলও রাখা হলো না। ওই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে কিছুটা সংশোধন আনতে রকেট সায়েন্স জানতে হয় না। অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ভিত্তিতেই এটি করার কথা ছিল, কিন্তু সেটি হয়নি। তার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। তিনি আশা করেন, আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট যেন বাস্তবতার আলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক হয়।

অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান বলেন, সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি ভোগাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আসছে বাজেটে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দিকে অধিক নজর দেবে সরকার। যাতে বাজেট ঘাটতি ধারণযোগ্য পর্যায়ে রেখে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়। পাশাপাশি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ডিজিটালাইজেশনে মনোযোগ বাড়ানো হবে। বাজেট প্রণয়নের জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাতের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে, আগামীতে আরও হবে। সবার মতামত নিয়ে একটি যৌক্তিক বাজেট দেওয়া হবে।

জ্বালানি তেলের দাম প্রতি মাসে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে জানিয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী বাজেটে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানে বাড়তি নজর দেবে সরকার।

সাবেক অর্থ ও বাণিজ্য সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় পার করছে। বিশ্বের ন্যায় দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। আগে বাজেটে বড় লক্ষ্য ছিল প্রবৃদ্ধি অর্জন, এখন বাস্তবতার নিরিখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নজর দিতে হবে। সরকারিভাবে এটি প্রথম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

মাহবুব আহমেদ বলেন, গত এক বছরে চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে প্রবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু বিতরণ বা সরবরাহ ব্যবস্থায় পিছিয়ে আছে। এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারিনি। ফলে নানারকম অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেছে। এতে বৈষম্য অনেক বেড়ে গেছে। আগামী বাজেটে কর আদায়ে বেশি জোর দিতে হবে। যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ধরে রাখার পাশাপাশি বৈষম্য দূর করা যায়।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, চড়া মূল্যস্ফীতি- উৎপাদনশীলতা হ্রাসের এ সময়ে যথাযথ সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবেশ্ব এমন আশা করাটা বোকামি। বাজেটের আগে ঘটা করে ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার কথা শোনা হয়। তবে এসব সমস্যা সমাধানে কোনো কার্যকরী উদ্যোগ নেয় না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে আগামী বাজেটে নজর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ফলপ্রসূ না হলেও এর কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, আর্থিক খাতে অনিয়মে একশ্রেণির ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সুবিধা পাচ্ছে। তাদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। আর আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে আবার ঋণ পরিশোধ করছেন। ভালো ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। কারণ তারা কিছু পান না। আগামী বাজেটে জিএসপি প্লাস ট্রানজিশনের বিষয়ে প্রতিফলন দেখতে চান তারা।

ইআরএফ সভাপতি মোহাম্মাদ রেফায়েত উল্লাহ মীরধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত