তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের অসহনীয় লোডশেডিং। ফলে শিল্প-কারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেচে ঠিকমতো বিদ্যুৎ না পাওয়ার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে প্রচন্ড গরমে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত।
ঈদের ছুটিতে যারা বাড়ি যাবেন তাদের ভুগতে হবে বেশি। ছুটিতে যাওয়ার আগে শিল্পের কোনো কোনো খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎসেবায় কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না বলে বিদ্যুৎ বিভাগ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করলেও গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ঢাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সহনীয় হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না কয়েক দিন ধরে।
ইফতার, সাহরিতেও মিলছে না স্বস্তি। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হুটহাট করে চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। এলাকাভেদে চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ ভাগ বিদ্যুৎ কম পাচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে লোডশেডিং করেই তাদের পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।
এদিকে দেশ জুড়ে মৃদু তাপপ্রবাহ চলছে। চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী কয়েক দিন তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
গ্রামাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত পরিবহনচালকসহ বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন পেশার মানুষের আয় কমেছে লোডশেডিংয়ের কারণে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্কদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ অফিস-আদালতে কাজে বিঘ্ন ঘটছে। শিক্ষার্থীদেরও পড়ালেখায় ক্ষতি হচ্ছে। এমন নানামুখী সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ না বাড়ানো পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে পড়েছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দিন যত এগোবে, লোডশেডিংয়ের পরিমাণ তত বাড়বে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির জন্য সাগরে সামিট গ্রুপের একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ শেষে ৩ এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল পুনরায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে। তখন বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে এলএনজি টার্মিনালটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়।
বিদ্যুৎ খাতে দিনে গ্যাসের চাহিদা ২৩২ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা যায় না কখনই। এবার গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এজন্য কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির পাশাপাশি অন্তত ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে পিডিবি। কিন্তু এখন সরবরাহ করা হচ্ছে ১০০ কোটি ঘনফুটের মতো। গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে।
কয়লা থেকে উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট। সক্ষমতার প্রায় পুরোটা ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও কয়লা-বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা আছে। বেসরকারি খাতের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া জটিলতাও কাটেনি। জ্বালানি তেল আমদানির জন্য নিয়মিত ডলার পাচ্ছে না তারা। তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা আছে প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট। দিনের বেলায় এক হাজার মেগাওয়াটের কম উৎপাদন করা হচ্ছে। রাতে উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ তিন হাজার মেগাওয়াট।
ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুরের একটি পেপার মিলের মালিক গত বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১ এপ্রিল সারা দিনে ছয়বার লোডশেডিং হয়। এ কারণে সকাল ৯টা থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত অন্তত আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না তার কারখানায়। এর মধ্যে প্রতিবারে সোয়া এক ঘণ্টা থেকে পৌনে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। পরদিন অর্থাৎ ২ এপ্রিলও অন্তত সাতবার লোডশেডিং হয়েছে তার কারখানায়।
তিনি বলেন, কারখানায় মেশিন চালু করেই সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন শুরু করা যায় না। কিছুটা সময় দিতে হয়। কিন্তু এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার উৎপাদনের মাঝপথে হঠাৎ বিদ্যুৎ যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হচ্ছে। ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে কারখানা সচল রাখা সম্ভব নয়। বিদ্যুতের কারণে কারখানা টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এবার ঈদে কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঘন ঘন লোডশেডিং মানা কষ্টকর। বরং একটানা একবার দিয়ে দিলেই হয়। স্থানীয় পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কাছে একাধিকবার অনুরোধ করেছি, ঘন ঘন অল্প অল্প করে লোডশেডিং না দিয়ে একটু দেরি করে দেন, যাতে আমরা কিছুটা উৎপাদন করতে পারি। কিন্তু তারা তাদের ইচ্ছেমতো লোডশেডিং দিচ্ছে। শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানির কারণে কারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আমরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। বৈশ্বিক কারণে এমনিতেই বিদেশি ক্রেতার অর্ডার কমে গেছে। এরপরও ঠিকমতো গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। সব মিলে আগের চেয়ে কারখানার উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক কারখানার মালিককে জরিমানা দিতে হচ্ছে। অর্ডার বাতিল হচ্ছে অনেকের। আমরা সরকারের কাছে নানাভাবে কষ্টের কথা জানিয়েছি। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। এখন আর বলে কোনো লাভ নেই।’
তৈরি পোশাক কারখানার পাশাপাশি সিরামিক শিল্পে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে লোডশেডিংয়ের কারণে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিরামিক পণ্য তৈরির জন্য চুল্লির তাপমাত্রা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। তার আগেই যদি বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে আবার নতুন করে চুল্লি গরম করতে হয়। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গায় অটোরিকশাচালক শরিফুল ইসলাম বলছিলেন, দিনে তিন-চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। অটোরিকশার ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ দিতে না পারার কারণে বেশিক্ষণ গাড়ি চালানো যায় না। এতে আয় অর্ধেকে নেমেছে। আবার ব্যাটারির ওপরও চাপ বাড়ছে। অনেক সময় মাঝপথে গাড়ি বন্ধ হয়ে যায় চার্জের অভাবে। তখন ভোগান্তির আর শেষ থাকে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘আজকের এ পরিস্থিতির জন্য বৈশ্বিক পরিস্থিতির চেয়ে সরকার বেশি দায়ী। ভুলনীতির কারণে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান না করে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। এতে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে দফায় দফায়। অতিরিক্ত দাম দিয়েও মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। কৃষি খাতের মতোই এ খাতকে প্রণোদনা দিয়ে চালিয়ে নিতে হবে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কমায় ১৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কম হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বিদ্যুতের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে কৃষি সেচে। কৃষক তার জমিতে ঠিকমতো সেচ দিতে না পারলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। যার ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকার কৃষক ছমির আলী জানান, বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপের পানিতে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে মাটি অনুযায়ী গড়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সময় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া সময়মতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চললে আবাদ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
