সাজা শেষে হয় না পুনর্বাসন

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫১ এএম

ফৌজদারি অপরাধের বিচারের সাজা শেষে (খালাস কিংবা সাজার মেয়াদ শেষ) যারা মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন, সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসা এবং বিশেষ করে কর্মজীবনে ফেরা তাদের জন্য সহজ হয় না। এদের পুনর্বাসনে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহায়তা নেই বললেই চলে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ক্ষুদ্র একটি কার্যক্রম চলে থোক বরাদ্দে ও অপ্রতুল অনুদানে। কারাবাসজনিত মানসিক পীড়ার হাত থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে কোনো মানসিক চিকিৎসা বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। তারা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও মানসিক যাতনার শিকার হন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার’ নামে যে একমাত্র কার্যক্রমটি চলে, তাতে সাজা শেষে কারামুক্তদের পুনর্বাসনে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটিও নামমাত্র। এই লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন কমিটি’ থাকলেও অনেকগুলো কমিটি সক্রিয় নয়।

পুনর্বাসন ও সংশোধনের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে প্রতি অর্থবছরে কমিটিকে কিছু নির্দিষ্ট অর্থ থোক বরাদ্দ হিসেবে দেওয়া হয়। বিভিন্ন জেলায় এ বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও একেক জেলায় একেক রকম। কারাজীবনেই বন্দিদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। কারামুক্ত হওয়ার পর এদের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী এককালীন রিকশা, ভ্যান কিংবা ছোট দোকানের পুঁজি দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দীর্ঘ কারাবাসের কারণে বন্দিদের অনেকে শারীরিক ও মানসিক অবসাদে ভোগেন, কর্মক্ষমতা ও কাজের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ সামাজিক অবমাননা এড়াতে ঠিকানা পরিবর্তন করেন। নতুন জায়গায় তারা একই সঙ্গে মানসিক ও সামাজিক নিঃসঙ্গতায় পড়েন। তাদের এসব দুরবস্থার খোঁজ কেউ রাখে না।

লঘু অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ‘কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন, ২০০৬’ নামে একটি আইন রয়েছে। এতে দন্ডিত নারীদের কারাগারে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে পুরুষ কয়েদিদের ক্ষেত্রে এ সুবিধা নেই। আর মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে প্রশিক্ষণের বা কাজের সুযোগ না থাকলেও যাবজ্জীবন বা অন্য মেয়াদে দন্ডিতদের সে সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা কারাবাস শেষে বেরিয়ে আসেন তাদের রাষ্ট্রীয় সুবিধাসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তাদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে এবং অবশ্যই তাদের মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। নয়তো তারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়বেন।’

ছয় ধাপের প্রক্রিয়ায় অর্থ যায় কমিটিতে

সমাজকল্যাণ পরিষদের দেওয়া গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, বন্দিদের পুনর্বাসন ও সংশোধনের লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৪ জেলার জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি টাকা। পরের দুই অর্থবছরে এ বরাদ্দের পরিমাণ এক টাকাও বাড়েনি। উল্টো ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে এ বরাদ্দ কমে গিয়ে হয়েছে ৬৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতি অর্থবছরে প্রতিটি জেলার জন্য গড়ে বরাদ্দ থাকে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ আসে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান দেওয়া হয় সমাজকল্যাণ পরিষদকে। এরপর পরিষদ পরিচালনা বোর্ডের অনুমতি সাপেক্ষে সমাজসেবা অধিদপ্তর হয়ে এ অর্থ চাহিদা সাপেক্ষে দেয় জেলার কমিটিকে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিবছর কতজন মুক্ত ব্যক্তি সুবিধা পেয়ে থাকেন, সে বিষয়ে অধিদপ্তর ও পরিষদে কোনো তথ্য থাকে না। মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে প্রতি জেলায় বছরে ১ থেকে ৫ জন ব্যক্তি পুনর্বাসনের আওতায় আসেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন কমিটির অধীনে এখন পর্যন্ত উপকারভোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৮৬০ জন। সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারিভাবে নির্দিষ্ট বাজেট না থাকায় সরাসরি কমিটিকে এ বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। কী খাতে কীভাবে খরচ হয়, সে বিষয়ে আমাদের অবহিত করা হয় না। আমরাও তা জানতে চাই না। নিজ নিজ দপ্তরে এ হিসাব থাকে।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সালেহ্ মোস্তফা কামাল দেশ রূপান্তরকে জানান, আর্থিক বরাদ্দের বিষয়ে তাদের শুধু অবহিত করা হয়। বাকি কাজ করে কমিটি। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের মোটামুটি মানসম্মতভাবে থাকা, খাওয়া, পরার জন্য যতটুকু লাগে, সে হিসাবে এই অর্থ যথেষ্ট নয়। দেখা গেল ১২ জনের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু লোক হয়ে গেছে ১৪ জন। তখন এই বরাদ্দের মধ্যেই সবাইকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হয়।’ 

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন থেকে জানা যায়, হত্যা মামলায় ২৪ বছরের বেশি সময় কারাবাসের পর গত বছরের জানুয়ারিতে মুক্ত জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তিকে একটি কম্পিউটার দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই ব্যক্তি সমাজসেবা অধিদপ্তরের তদারকিতে আছেন। এ ধরনের পুনর্বাসন বছরে একটি বা তিনটির বেশি হয় না।’ তিনি বলেন, ‘কেউ মুক্তি পেলে কারাগার থেকে আমাদের অবহিত করা হয়। যারা একটু সচ্ছল, তাদের এ বিষয়ে আগ্রহ নেই। যেসব দরিদ্র ব্যক্তির কিছুই নেই, তাদের বিষয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে, এটা শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেই করতে হবে, এমন নয়। স্থানীয়ভাবেও এটি করা যেতে পারে।’ 

কারাগারে প্রশিক্ষণে কারাবন্দিরাই বিশেষজ্ঞ : কারামুক্ত ব্যক্তিরা যাতে আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে না পড়েন, সেজন্য কারাগারে নারী ও পুরুষ বন্দিদের (কয়েদি) বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বন্দিরা টেইলারিং বা কাপড় সেলাই, বাঁশ ও বেতের কাজ, বাটিকের কাজ, মোবাইল ও কম্পিউটার সার্ভিসিং, টেলিভিশন ও ইলেকটনিক সামগ্রী সারাই, ক্ষৌরকাজ, জুতা তৈরি ও পশুপালন শেখেন। কারামুক্তির পর প্রশিক্ষণের ধরন ও ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী এককালীন বরাদ্দ দেয় কমিটি। তবে, কারা অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ কোনো বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে হয় না।

কারা অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েদিদের মধ্যে যারা এসব বিষয়ে কিছু ধারণা রাখেন, তারাই অন্যদের প্রশিক্ষণ দেন। এ বিষয়টি নিয়ে অনেক সময় আলোচনা হলেও বছরের পর বছর এভাবেই চলছে।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৫৮ জন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৪৮৪ জন ও ২০২২- ২৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৬৩১ জনসহ তিন বছরে ১১ হাজার ৫৭৩ জন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

কাউন্সেলিং নেই : কারাগারে দীর্ঘ বন্দিজীবন গভীর মানসিক পীড়ার জন্ম দেয়। বেশ কয়েকজন মুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও অবসন্ন বোধ করেন। তাদের নিয়মিত মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ (কাউন্সেলিং) প্রয়োজন হয়। দেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও কারা সূত্রে জানা গেছে, বন্দিদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কয়েক মাস ধরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্দিষ্ট সময়ে একজন মানসিক চিকিৎসকের মাধ্যমে বন্দিদের পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অন্য কারাগারগুলোতে এ ব্যবস্থা নেই। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কারাবন্দি কিংবা কারাবাস শেষে বেরিয়ে যাওয়া লোকদের কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থার উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হলে মুক্ত জীবনে আসা অনেকেই স্বাভাবিক জীবন ও সমাজে ফিরে আসবে, তেমনি পুনরায় অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে রোধ করা যাবে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ কারাবাসের কারণে তারা সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ কারণে তাদের মনঃকষ্ট, ডিপ্রেশন (বিষন্নতা) দুঃখ-বেদনাসহ নানা মানসিক যাতনা থেকে মানসিক বিকার দেখা দেয়। একধরনের অবসাদে ভোগেন। কারও সঙ্গে মিশতে পারেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারাগার বন্দিশালা নয়, সংশোধনাগার এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। কারাগারের ভেতরে ও বাইরে ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাটা খুব জরুরি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত