বর্তমান বিশ্বে হাতেগোনা কয়েকটি দেশে টিকে রয়েছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ক্ষমতাসীন রাজপরিবারগুলো কয়েকশ বছর ধরে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘটনাবহুল নানা কিছুর সাক্ষী হয়ে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে বিদ্যমান রাজতন্ত্রগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডের রাজপরিবারটি প্রায়ই নানা কারণে আলোচনায় থাকে। সম্প্রতি থাই রাজবংশের প্রয়াত এক রাজার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হয়েছে বলে এত দিনের বর্ণনা আরও একবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
১৯৪৬ সালে থাইল্যান্ডের তৎকালীন রাজা আনন্দ মাহিদোলাকে গুলি করে হত্যা করা হয় রাজপ্রাসাদের শয়নকক্ষে। অর্থাৎ প্রায় ৭৮ বছর আগে ঘটে সেই ঘটনা। রাজা আনন্দ বর্তমান থাই রাজা মাহা ভাজলংকর্নের চাচা। সাবেক রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের বড় ভাই। এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিতর্ক হলো, তাকে কি গুলি করে হত্যা করা হয়, নাকি তিনি আত্মহত্যা করেন।
এ মামলা আবারও চালু করার আবেদনের শুনানি শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। রাজধানী ব্যাংকক ফৌজদারি আদালতে শুক্রবার শুনানি হয়েছে। মামলা চালু হবে কি না, আদালত সেই নির্দেশ দেবে।
‘রাম অষ্টম’ নামে খ্যাত রাজার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া জট উন্মোচনে পিটিশন দাখিল করেছিলেন কুঙ্গওয়াল বুদ্ধিভানিদ। ৬২ বছরের অভিজ্ঞ রসায়নবিদ সাবেক ব্যবসায়ী নির্বাহী কুঙ্গওয়াল ২০২০ সালে একটি বই লেখেন। এই বইয়ে তিনি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারি ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ করেন। আনন্দ হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়া প্রাসাদ কর্মকর্তা চিৎ সিংসেনির নাতনি ওয়াতসাতার্ন কিত্তিপিনিওর পক্ষে মামলা চালু করার আর্জি জানান কুঙ্গওয়াল।
হত্যাকান্ডের অভিযোগে প্রাসাদের তিনজন কর্মকর্তাকে রাজহত্যায় জড়িত থাকার অপরাধে দোষীসাব্যস্ত করা হয়। ১৯৫৫ সালে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।
১৯৪৬ সালের ৯ জুন মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঘরের বিছানায় দেহ মেলে ২০ বছর বয়সী আনন্দের। তিনি ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। সরকারি তদন্ত এবং ১৯৫৪ সালে শেষ হওয়া তিনটি আদালতের রায় অনুসারে তাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছিল বলে বর্ণনা করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও বলা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রিদি ব্যানোমিয়ং এই ষড়যন্ত্র করেন। পরে প্রিদিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
আদালতে কুঙ্গওয়াল বলেছেন, তিনি প্রমাণ করতে পারেন, রাজার বন্দুক তার মৃতদেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল। ওই বন্দুকের মাধ্যমে রাজার মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, ‘আমি নতুন প্রমাণ জোগাড় করে এনেছি।’ গত বছর একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরিচালিত ব্যালিস্টিক পরীক্ষার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, রাজা নিজের বন্দুক দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন।
রাজা আনন্দের মৃত্যু নিয়ে কয়েক দশক ধরে ২৪টির বেশি বই লেখা হয়েছে। অনেক অভিজ্ঞ মানুষজনই সরকারি রায়কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। আনন্দসংক্রান্ত কয়েকটি বই থাইল্যান্ডে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপকভাবে বিতরণও করা হয়। তবে বেশিরভাগ বই সত্তর দশকে নিষিদ্ধ করে কর্তৃপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থিত ছিলেন চিৎ সিংসেনির নাতনি ওয়াটসতারন কিত্তিপিনিও। তিনি বলেন, এই মামলা থেকে নিজের ‘নিরপরাধ’ দাদুর নাম যাতে মুছে যায়, সেটাই তিনি চান।
