বেসিক ব্যাংক সরকারি মানছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০ এএম

বেসরকারি সিটি ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের একীভূতকরণের বিরোধিতা করছেন বেসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের আশঙ্কা বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হলে তারা সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা হারাবেন। তবে ব্যাংকটির শতভাগ শেয়ারের মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও এটি কোনো আইন বা আদেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণে বেসিক ব্যাংককে সরকারি বলে স্বীকার করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ক্ষুদ্র শিল্পে অর্থায়নের জন্য বেসরকারি খাতে একটি ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা থেকে ১৯৮৮ সালে কোম্পানি আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় বেসিক ব্যাংক। বিসিসি ফাউন্ডেশনের ৭০ শতাংশ ও সরকারের ৩০ শতাংশ মালিকানা নিয়ে ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীকালে বিসিসি ফাউন্ডেশন অকার্যকর হয়ে পড়ায় ১৯৯২ সালে বেসিক ব্যাংকের শতভাগ মালিকানা গ্রহণ করে সরকার। তাই ব্যাংকটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন হলেও এটিকে জাতীয়করণ করা হয়নি এবং আগের মতোই বেসরকারি ব্যাংকের মতো কাজ করে বলে বেসিক ব্যাংক তার করপোরেট প্রোফাইলে জানিয়েছে। তবে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদোন্নতি, অবসর-ভাতার মতো সরকারি সুবিধাগুলো পেয়ে থাকেন। এমনকি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগও অর্থ মন্ত্রণালয় দিয়ে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে বেসিক ব্যাংক সরকারি নাকি বেসরকারি তা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে।

শতভাগ সরকারি মালিকানার ব্যাংক হলেও বেসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি নন জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক বলেন, বেসিক সরকারের কোনো ব্যাংক অর্ডারের দ্বারা স্থাপিত ব্যাংক নয়। সোনালী ব্যাংকের যেমন ব্যাংক অর্ডার আছে, বেসিকের তেমন নেই। একটা আইন দ্বারা কিন্তু সোনালী রূপালী অগ্রণী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত। বেসিক ব্যাংক কোনো আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকার যেমন অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ করে, তেমনি বেসিকেরও শেয়ার করছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি ব্যাংক আর বেসিক ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সরকার যেটা রেভিনিউ থেকে দেয় সেটাই কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে সরকারের বাণিজ্যিক কাজের জন্য প্রতিষ্ঠিত করা। বেসিকও তেমন একটা প্রতিষ্ঠান। বেসিক বিশেষায়িত একটা ব্যাংক ছিল, যেটা একটা বিশেষ উদ্দেশ্য গঠন করা হয়েছিল। এটা কিন্তু ব্যাংক হিসেবে সরকারের আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়।

এদিকে বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হতে চাচ্ছেন না বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাই সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার দাবিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই দাবিতে অর্থ মন্ত্রণালয়েও স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।

গভর্নরকে দেওয়া স্মারকলিপিতে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, দেশের ক্ষুদ্র শিল্পে অর্থায়নের লক্ষ্যে ১৯৮৯ সালে বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু হয়, যা ১৯৯২ সালে শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে একটি রাষ্ট্র মালিকাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে সরকারি আর্থিক সেবা প্রদান করে আসছে, যা ২০১৫ সালে পুরোপুরি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে রূপান্তরিত হয়। বেসিক ব্যাংক একটি সরকারি খাতের ব্যাংক হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করেছে এবং প্রায় ২৩ বছর ধরে বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল অঙ্কের মুনাফা প্রদান করেছে, যা অন্যান্য ব্যাংকের কাছে ছিল উদাহরণ।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, শতভাগ রাষ্ট্র মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকে অন্যান্য রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের অনুরূপ চাকরি বিধিমালা অনুসরণ করা হয়, যা বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী বেসিক ব্যাংককে বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেড নির্ধারণ এবং বেতন ও অন্যান্য ভাতাদি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা বলবৎ রয়েছে। এ ছাড়া বেসিক ব্যাংকে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সম্পূর্ণরূপে সরকারি ব্যাংকের অনুরূপ বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়। বেসিক ব্যাংকে ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের স্থায়ী চাকরি বিদ্যমান রয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেসিক ব্যাংকে সরকারি শ্রম অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ও রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি যে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একীভূতকরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বেসরকারি মালিকানাধীন সিটি ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের একীভূতকরণের বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অযৌক্তিক। এ ধরনের বৈষম্যনীতি পরিহার করে রাষ্ট্র মালিকানাধীন অন্য ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রেখে বেসিক ব্যাংককে অন্য একটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণের আবেদন জানানো হয়।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনেকেই সরকারি ব্যাংকের পদোন্নতির অধীনে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং বিভিন্ন সরকারি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজনকে সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদায়নের পর রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংককে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে দুজনকে ডিএমডি হিসেবে, একজনকে জনতা ব্যাংকে এবং দুজনকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে জিএম হিসেবে পদায়ন করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত