উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটারদের উৎসাহিত করতে প্রচারপত্র বিলি করবে আওয়ামী লীগ। গতকাল মঙ্গলবার ক্ষমতাসীন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ ঘোষণা দেন।
সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে না যায়, সে জন্য প্রচার চালাতে দলীয়ভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এমন অবস্থায় ভোটারদের উৎসাহিত করতে আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র বিলির ঘোষণা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জনগণকে উপজেলা নির্বাচনে ভোট প্রয়োগে উৎসাহিত করতে প্রচারপত্র বিলি অনুষ্ঠানের উদ্বোধনও করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির উদ্যোগে এই প্রচারপত্র বিলি করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সারা দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত ভোটের পক্ষে প্রচারপত্র বিতরণ করব। সর্বস্তরের মানুষকে আমাদের জানাতে হবে।’
ভোটকেন্দ্রে মানুষকে না যাওয়ার জন্য বিএনপির প্রচারণার বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি প্রচারপত্র বিলি করে জনগণকে তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারা দেশে ৩০০ আসনে ভোট পড়ার হার ৪১ শতাংশের বেশি। যদিও বিএনপি নির্বাচন কমিশনের এই হিসাব উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ভোটার ভোটকেন্দ্রে যায়নি। ভোট পড়ার হার বাড়িয়ে বলছে কমিশন।
উল্লেখ্য, সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়নের পাশাপাশি দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৬২ স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে এবং দলের শক্তি-সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য দলীয় মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার ভোটকেন্দ্রে আনতে প্রচারপত্র বিলির ঘোষণায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই নানা সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই ঘোষণাকে দলের অনেকেই দেখছেন, বিএনপির ভোট বর্জনের বিষয়টি আওয়ামী লীগের স্বীকার করে নেওয়া হিসেবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের মানুষ ভোট দিতে না আসার অন্যতম কারণ দুটি। এর মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া ও ভোটকেন্দ্রে ভোটার আসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দলীয় নেতারাই বলেন, এই দুই কারণের জন্যই আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা দায়ী।
পর্দার আড়ালে বেশ সমালোচনা করলেও প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে কেন্দ্রে না আসার জন্য নির্বাচনবিমুখ দল বিএনপি প্রচারণা চালাচ্ছে। সেটি মোকাবিলা করার অংশ হিসেবে ভোট দিতে জনগণকে কেন্দ্রে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে আওয়ামী লীগ প্রচারপত্র বিলি করার কার্যক্রম শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ জনগণকে বলতে চায়, বোঝাতে চায় যে ভোট সাংবিধানিক অধিকার। এটাই মূল উদ্দেশ্য।
ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা এ ঘোষণাকে নেতিবাচকভাবে নিলেও দলের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবকিছু নেগেটিভ হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদের দলের অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে প্রচার-প্রকাশনাও একটি। তাদের কিছু কাজ দেওয়াও এ ঘোষণার অংশ।’ তিনি বলেন, এই প্রচারপত্রে শুধু ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করাই নয়, আরও অনেকগুলো বিষয় আছে। বিএনপি জনগণকে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার রাজনীতি করছে। আওয়ামী লীগ কি বসে থাকবে? জাফরউল্যাহ আরও বলেন, রাজনৈতিক কিছু পর্যবেক্ষণ সব দলেরই থাকে।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়ে প্রথম দফায় স্থানীয় সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এক হয়ে ওই নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার নজির নেই। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ এই নেতার দাবি, মানুষের ভেতরে ভোট বর্জনের মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। এ জন্যই ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে এখন প্রচারপত্র বিলি করার ঘোষণা দিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। তার পরামর্শ হলো, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়া ও ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের যে কর্মকান্ড, সেটি বন্ধ করা গেলেই সুফল আসবে। ভোটে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রচারপত্র বিলি করা লাগবে না। এমনিতেই মানুষ ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে আসবে।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রচারপত্র বিলি করলেই কি আর না করলেই কি? প্রচারপত্র দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে না।
এগুলো নিয়ে মানুষের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা জানে যে পাঁচ বছরের জন্য আওয়ামী লীগ সব নিরাপদ, ভোট হোক না হোক, তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। কতগুলো নিয়ম রক্ষার জন্য নির্বাচনগুলো করবে তারা।’
তার দাবি, ‘এটা শুধু একটা পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডার মতো। এগুলো তেমন কিছু না। কথা বলতে হবে, বিরোধী দলকে গালি দিতে হবে। এগুলো হলো কতগুলো টিমওয়ার্ক। এর মধ্যে তেমন কোনো বৈচিত্র্য নেই।’
পরামর্শ রেখে তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘এখন বাংলাদেশ বাদ দিয়ে পশ্চিম বাংলার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলে বুঝবেন যে ইলেকশন (নির্বাচন) কাকে বলে। এর পেছনে কেমন খাটতে হয়, সাংবাদিকদের কেমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এগুলো দেখেন। আমাদের এখানে প্রশ্ন করার সাংবাদিক নেই একজন, নেই একজন উত্তর দেওয়ার মতো নেতা।’
