নিজের পাঁচ বিঘা জমির মৎস্য ঘেরে সাদা মাছের চাষ করেছেন ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আনিসজ্জামান। তিনি জানান, ঘেরের মাছ এ বছর বিক্রির উপযোগী হয়নি। কিন্তু চলতি সূর্যের তাপে প্রতিদিন সকালেই মাছ ভেসে ওঠছে। তাই মাছের আকার ছোট থাকলেও বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এতে তার অনেক লোকসান হয়েছে।
একই উপজেলার গোনালী দক্ষিণ বিলে ধান কাটছেন একদল শ্রমিক। এরমধ্যে শ্রমিক রেনু বেগম জানান, তাপে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। মুখে আগুনের ঝলক এসে লাগছে। ঘামতে ঘামতে শরীর ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কাজ ছাড়া পেটে ভাত জুটবে না। তাই নিরুপায় হয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
সূর্যের প্রচন্ড তাপদাহে পুড়ছে মানুষ আর পানিতে ভাসছে মাছ। শুধুই তাই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলীয় জেলা খুলনায় রেকর্ড তাপে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশেও। ফলে নানা সংকটে অর্থনৈতিক খাত ও মানুষের যাপিতজীবন। তবে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, কৃষি ও মৎস্য খাতে। উপকূলে উপজেলায় লবণাক্ততায় মানুষ হচ্ছে দিশেহারা। হচ্ছে বাস্তুচ্যুতও। শহর-গ্রামজুড়ে চলছে সুপেয় পানির জন্য চরম হাহাকার।
উপকূলীয় উপজেলার কয়রার নলপাড়ার বাসিন্দা কবিতা মুন্ডা জানান, গ্রামে সবচেয়ে সুপেয় পানির সংকট। চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময় পার হয়ে যায় মিঠা পানি সংগ্রহে। অন্যদিকে গৃহস্থালি ও গোসলের কাজে লবণ পানি ব্যবহারে তাদের শরীর নানা রোগও বাসা বাঁধছে।
মহানগরী খুলনার ইকবাল নগর এলাকার গৃহিনী মাধুরী সরকার জানান, ডিপটিওবয়েলে চেপে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। অথচ কলস ভরছে না। একটি কলসী পানি ভর্তি করতে বিশ মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ৪ মে খুলনা জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই বছর ১ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল এসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ বছর ২৩ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থ্যাৎ ২০ বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমেছে শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া এবছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবীদ মো. আমিরুল আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নে গাছপালা কমে যাচ্ছে। খাল-বিল-নদী-নালা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। এতে প্রকৃতি এক এক সময়ে এক এক রককের আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। ঋতুর পরিবর্তন ঘটছে। পরিবেশে তাপমাত্রার তারতম্য হচ্ছে। গ্রীষ্মের সময় বেশি গরম পড়ছে। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত বেশি হচ্ছে, আবার গরমে অনাবৃষ্টিও দেখা যাচ্ছে। শীতের সময় ঠান্ডা বেশি অনুভূত হচ্ছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে মানুষকে।
তেরখাদার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা বাসিতুল হাবিব প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে জানান, বাজার থেকে তিন কেজি ওজনের তরমুজ ও এক কেজি বেদনা কিনেছেন। বাড়িতে আনার পর কেটে দেখা গেছে ভেতরে পুরোটাই সাদা। তেমন ভালো কোন স্বাদই নেই।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ অফিসার মহাদেব চন্দ্র সানা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কৃষিখাতে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। অধিক তাপে পানি সংকট তৈরি হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে। এছাড়া দাবদাহে মৌসুমী ফলের আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। স্বাদও কমে গেছে। ধান নিয়ে
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ধানের আগা শুকিয়ে চিটা হয়ে যাচ্ছে। তাই বিলম্বে লাগানো বোরোধান ক্ষেতে দুই থেকে তিন ইঞ্চি পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণ অফিসার আরো বলেন, গ্রীষ্মে খাল-বিল শুকিয়ে চৌচির। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদীর তলদেশ উঁচু ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে হিমালয়ের পানি প্রবাহিত না হওয়ায় বঙ্গপসাগরের পানি উপরে এসে লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে।
উদাহরণ টেনে মহাদেব চন্দ্র সানা বলেন, খুলনা জেলায় ২৭২টি খননযোগ্য খাল রয়েছে। যার দৈঘ্য ৫৯৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার। এসব খালে ৩১টি স্লুইসগেটের অস্তিত্বই নেই। ৯৭টি স্লুইসগেট মেরামত করতে হবে। এছাড়া ১৫৫ টি প্রবাহমান খালে ১৩৪টি স্লুইসগেট রয়েছে। যারমধ্যে ৪৩টি মেরামত করা জরুরি। এছাড়া খননযোগ্য ও প্রবাহমান ৪২৭টি খালের ২০৯টি খাল ইজারা দেওয়া রয়েছে। এসব খালে পানি প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে ধানজাত পরিবর্তন করতে হচ্ছে। লবণাক্ত সহিঞ্চু সূর্ষমুখী, তিল, মুখ, তরমুজ, ঢেঁড়শ ও ভুট্টা চাষে কৃষকদের আগ্রহী করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে অনেক সময় অসময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তখন ফসলের জন্য ওই বৃষ্টি প্রয়োজন নেই। আবার দেখা যাচ্ছে অসময়ে তীব্র শীত পড়ছে। তখন বীজতলা ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কারণ এসব পরিবেশ সামাল দেওয়া অনেক ব্যয় বহুল খরচ। যা কৃষকের পক্ষে যোগান দেওয়া সম্ভব না। ফসলেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়দেব পাল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী-খাল-বিল ভরাট হচ্ছে, তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে ও অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক মাছের উৎস বিলীন হচ্ছে। বৃষ্টি কম বা অনাবৃষ্টি এবং তাপমাত্রা বেড়ে গেলে মাছের প্রজনন হয় না। বৈশাখের বৃষ্টির পানিতেই মূলত মাছের প্রজনন হয়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় মাছ নানা রোগে আক্রান্তও হচ্ছে।
তিনি জানান, উপকূলীয় অঞ্চলেও সময়মতো লবণ পানি ঘেরে উঠানো যাচ্ছে না। এতে লবণ পানির মাছ হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পানির তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। পানিতে তাপমাত্রা আরও বেশি। যা মৎস্য খাতের জন্য এটি মারাত্মক দুশ্চিন্তার বিষয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মুজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাছ-পালা কাটা হচ্ছে, জলাশয় ভরাট হচ্ছে এবং প্রকৃতির মধ্যে (সুন্দরবনের মধ্যে) মানুষ বসবাস করছে। জলাশয় ভরাটের কারণে হিমালয় থেকে পানি আসছে না। বঙ্গপসাগরের পানি উপরে এসেছে লবণাক্ততা বাড়ছে। যার কারণে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। সূর্যের তাপমাত্রা ও লবণাক্ত বেড়ে যাচ্ছে। উভয় সংকটে মানুষের জীবন জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। গাছপালা, সুপেয় পানি ও খাবারের অভাবে উপক’লীয় মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।
তিনি বলেন, শহরে বালু ও কংক্রিট দিয়ে উপরীভাগ ঢেকে ফেলা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে যেতে পারছে না। বাষ্প হয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। পানি নিচে যেতে না পারার কারণে লেয়ার পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে শহরের ডিপ-টিওবয়েলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
