২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারিখটি স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘের ১৯ বছরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সেদিনই শীর্ষ লিগে অভিষেক হয়েছিল ২০০৫ সালে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া ক্লাবটির। শীর্ষ ফুটবলে অভিষেকটা তারা রাঙিয়েছিল প্রবল প্রতিপক্ষ বসুন্ধরা কিংসকে হারিয়ে। স্বপ্নের মতো শুরুর পর অবশ্য বারবার থমকে যেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের শেষ দল হিসেবে তাদের নেমে যেতে হয়েছিল পরের ধাপে।
পতনের শেষ সেখানেই নয়। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকেও অবনমন ঘটে পরের মৌসুমে। এখন তাদের স্থান মহানগর সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লিগে। এই ক্রমাগত পতনে বিদায়ের পথ প্রশস্ত হয় ক্লাবটির তৎকালীন কর্তাদের। চলতি বছরেই ক্লাবটির দায়িত্বে এসেছেন এক ঝাঁক নতুন মুখ। আর নতুনরা দায়িত্ব নিয়েই দেখছেন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।
লক্ষ্যটা বড়- বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ফেরা। সেটা করতে হলে দুই ধাপ পেরোতে হবে। যার প্রথমটি সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লিগ। আসন্ন ঈদ-উল-আজহার দশদিন পর শুরু হতে যাওয়া লিগে চ্যাম্পিয়ন হতে তারা গড়েছে শক্তিশালী দল। স্বপ্ন দ্রষ্টা হিসেবে ক্লাবটি পেয়েছে পরীক্ষিত কোচ কামাল বাবুকে। আর পেছন থেকে রয়েছে বড় স্বপ্নে বিভোর এক ঝাঁক কর্মকর্তা। নতুন সভাপতি সৈয়দ গোলাম রূপসের নেতৃত্বে স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘ চাইছে মাঠে সেরা হয়ে ফিরতে।
ক্লাবগুলোর অনুরোধের প্রেক্ষিতে লিগ কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে ঈদের পরে। আগে থেকেই দল গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘ তাই বাধ্য হয়েই বাছাইকৃত ৩৪ খেলোয়াড়কে ছুটিতে পাঠাচ্ছে। তার আগে অবশ্য বুধবার রাতে ফুটবলারদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন ক্লাব কর্তারা। সেখানে খেলোয়াড়-কোচরা যেমন দিয়েছেন ভালো ফুটবলের প্রতিশ্রুতি, ঠিক তেমনই কর্তারা দিয়েছেন সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস। আর এই দুইয়ের সংমিশ্রণে সাফল্য ছুঁতে মরিয়া স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘ।
কামাল বাবু খিলগাঁও অঞ্চলের মানুষ। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের বড়-ছোট অনেক দলকে সাফল্য এনে দেওয়া এই কোচ গেল কয়েক বছর প্রিমিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ক্লাবটির ফুটবল আগ্রহ কমে যাওয়াও মাঠের মানুষ কামাল বাবুও সরে দাঁড়ান। এরপর এলাকার ক্লাব স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘের কর্তাদের অনুরোধে দায়িত্ব নেন শক্তিশালী দল গড়ার। নিজের মতো করে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে পছন্দের ফুটবলারদের একত্রিত করে কমলাপুর স্টেডিয়ামে আয়োজন করেন ট্রায়ালে। যেই ট্রায়ালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগের খেলোয়াড়রা যেমন ছিলেন, তেমনই ছিলেন অনেক আন কোঁড়া তরুণ যারা এসেছেন বিভিন্ন জেলা লিগে খেলে। তাদের মধ্য থেকে ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে বেছে নিয়েছেন ৩৪জনকে। ক্লাব তাদের জন্য ব্যবস্থা করেছে উন্নত আবাসন ও খাওয়া দাওয়ার।
ক্লাবটির তরুণ সভাপতি রূপসের সাফ কথা, খেলোয়াড়দের সুযোগ সুবিধায় কোনো ঘাটতি রাখবে না, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি যারা চ্যাম্পিয়নশিপ এনে দেন, সেই খেলোয়াড়রাই থাকেন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। পায় না ভালো থাকার জায়গা, জুটে না ভালো খাবার। তাদের ভালো না রেখে কি করে ভালো ফলাফলের আশা করা যায়?’
এরপরই খেলোয়াড়দের আশ্বাস দিয়েছেন রূপস, ‘আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের জন্য সর্বোচ্চ মানের ফুডিং-লজিং এবং লজিস্টিক সাপোর্ট আমরা নিশ্চিত করব। তোমাদের সেরা মানের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, ক্রীড়া সরঞ্জামও হবে সর্বোচ্চ মানের। যাতে অন্য ক্লাবের খেলোয়াড়রা তোমাদের দেখে হিংসে করে। আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে তোমাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার। তোমরা কেবল নিজেদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করো। আমাদের লক্ষ্য একটাই ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া। চ্যাম্পিয়ন হতে হতে প্রিমিয়ার লিগে ফেরা।’
ক্লাবটির নতুন সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমানও স্বপ্নচারী মানুষ। তিনি শতভাগ আস্থা রাখছেন সর্বদ্রষ্টা কোচ কামাল বাবুর ওপর, 'আমরা ৫৫ জনের মধ্য থেকে ৩৫জনকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করেছি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার আমরা কামাল বাবু ভাইয়ের মতো সেরা কোচকে পাশে পেয়েছি। তার প্রতি ধন্যবাদ সাড়া দেশ থেকে খেলোয়াড় বাছাই করার জন্য।’
এরপর খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে মশিউর বলেন, ‘কামাল বাবু কামাল বাবুই। তার কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কামাল বাবুর অধীনে আপনাদের যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেই চেষ্টা আমরা করব। সব কিছুই দিবো। আপনারা শুধু ভালো খেলা উপহার দিন। ক্লাবকে সম্মানিত করুন। আপনাদের উদ্দেশ্য আপনারা হাসিল করেন, সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবের ভালো খেলে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণ করুন।’
দেশের ফুটবলের সেরা স্কাউট কোচের তকমা আগেই পেয়েছেন কামাল বাবু। ঢাকার ফুটবল ছাড়াও সারা দেশের ফুটবলে থাকে তার পাখির চোখ। বিশেষ কাউকে মনে ধরলেই তুলে নিয়ে আসেন, তৈরি করেন বড় মঞ্চের জন্য। স্বাধীনতাকে নিয়ে তিনিও শোনালেন আশার কথা, ‘আমরা সারা দেশে ঘুরে ঘুরে খেলোয়াড় সংগ্রহ করেছি। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ থেকে খেলোয়াড় এনেছি। তাদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। ক্লাব কর্তারা কথা দিয়েছেন খেলোয়াড়দের প্রিমিয়ার মানের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করবেন। আমরাও আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। সেরার লক্ষ্য হয়েই খেলব। তবে মনে রাখতে হবে শিরোপার সঙ্গে ভাগ্যও জড়িত।’
২০২২ প্রিমিয়ার লিগে তলানীতে শেষ করলেও বসুন্ধরা, সাইফের মতো দলকে হারানো, আবাহনী, শেখ জামালের মতো দলগুলোকে রুখে দিয়ে আশা জাগিয়েছিল স্বাধীনতা ক্রীড়া সংঘ। প্রথম ম্যাচে কিংসকে হারানোর সেই স্মৃতিটা পুঁজি করে এক ঝাঁক নতুন মুখ ফেরার স্বপ্নে শুরু করেছেন নবযাত্রা।
