শব্দদূষণ ও ইসলাম

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪১ এএম

দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ শব্দ। আলো, তাপ, বিদ্যুৎ ও চুম্বকের মতো শব্দও এক প্রকার শক্তি। বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন জোরালো এবং অপ্রয়োজনীয় শব্দ যখন মানুষের সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়ে বিরক্তির সৃষ্টি করে, সে অবস্থাকেই বলা হয় শব্দদূষণ। বাংলাদেশে মারাত্মক এক দূষণের নাম শব্দদূষণ। আমাদের সতর্কতার অভাবে দিন দিন এই দূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশে দূষণের শেষ নেই। পরিবেশ, বায়ু, পানি, নদী সবকিছুই দূষিত হচ্ছে। দূষণে দূষণে নগরজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শব্দদূষণ এখন মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। শহরের মানুষ শব্দদূষণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শব্দদূষণের শিকার সর্বশ্রেণি ও পেশার মানুষ। বিভন্নি জরিপ থেকে জানা যায়, শব্দদূষণের কারণে বাংলাদেশে ২৩টি রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু নগর নয়, প্রতিনিয়ত গ্রামও শব্দদূষণে দূষিত হচ্ছে। কারণ গ্রামগুলো দ্রুত নগরে পরিণত হচ্ছে। শহরের ভালো-মন্দ সবকিছু গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে।

পঁচাত্তর ডেসিবেলের চেয়ে উচ্চগতির শব্দ মানুষের সহনীয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে না। যত বিকট শব্দ তত বড় রোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলে চিকিৎসকদের মতামত রয়েছে। এ শব্দদূষণ হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। গাড়ির হর্ণ, মিল-কারখানার শব্দ, মাইকের আওয়াজ, সাউন্ড সিস্টেম, বিমানের আওয়াজ, পণ্যের বাণিজ্যিক প্রচার ইত্যাদির কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে। এরমধ্যে মাইকের ব্যবহারের কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মাইক ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার হচ্ছে। বিয়ে-শাদি, মিছিল-মিটিংয়ে মাইকের পাশাপাশি ঢোল-তবলাসহ আধুনিক বাদ্য ও শব্দযন্ত্রের অধিক ব্যবহারের কারণেও শব্দদূষণ হচ্ছে। শব্দদূষণ যে কারণে বা যেভাবেই হোক না কেন, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে তা বন্ধ করতে হবে। যেসব ভালো ও উন্নয়নমূলক কাজে মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে সেগুলোতেও সংস্কার ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

ইতিমধ্যে সবকিছুতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে এবং পরিবর্তন এসেছে। শব্দযন্ত্র ব্যবহারেও পরিবর্তন আনতে হবে। অপ্রয়োজনীয় মাইক বা শব্দযন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দেশের জনসংখ্যা বাড়ার কারণে গণজমায়েতের আকারও বেড়েছে। উপস্থিত সমাবেশের জন্য যতটুকু আওয়াজের প্রয়োজন, ততটুকু ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্টরা যেমন অধিকার বঞ্চিত হবে না, তেমনি অন্যদের কাজ, ঘুম, লেখাপড়া ইত্যাদিতে ব্যাঘাত ঘটবে না। রোগীরা কষ্ট পাবে না। এটিই মানবিক ও ধর্মীয় বিধান। আর শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইসলাম কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করেছে। মুসলিম হওয়ার মাপকাঠিই নির্ধারণ করেছে জিহ্বা দ্বারা তথা কটু কথা বা উচ্চ আওয়াজ করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া না দেওয়ার ওপর। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রকৃত মুসলিম সেই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি)

নিম্নস্বরে কথা বলার মাধ্যমে শব্দদূষণ রোধ করা সম্ভব। যেমন : যখন কথা বলবে তখন উঁচু গলায় কথা না বলে নিম্নস্বরে কথা বলবে, তাহলে তার দ্বারা পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে রক্ষা পাবে। পরিবেশ দূষণরোধে আল্লাহতায়ালা নামাজের মতো ইবাদতেও স্বর উঁচু না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘তোমরা সালাতে স্বর উচ্চ করো না এবং অতিশয় ক্ষীণও করো না। এই দুইয়ের মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১১০)।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা নীরবে করার জন্য পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক বিনয়ের সঙ্গে এবং গোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ ৫৫)।

আয়াতে কারিমায় নীরবে ও গোপনে দোয়া করা উত্তম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আয়াতের শেষে এ বিষয়ে সতর্কও করা হয়েছে যে, দোয়া করার ব্যাপারে সীমা অতিক্রম করা যাবে না। কেননা, আল্লাহতায়ালা সীমা অতিক্রমকারীকে পছন্দ করেন না। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা জাকারিয়া (আ.)-এর দোয়া উল্লেখ করে বলেন, ‘যখন সে তার পালনকর্তাকে অনুচ্চস্বরে ডাকল।’

(সুরা মারইয়াম ৩)।

কল্যাণে নিয়োজিত থাকতে এবং অকল্যাণ থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করে আল্লাহতায়ালা কোরআনে আরও নির্দেশ দেন, ‘আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, তোমার আওয়াজ নিচু করো, নিশ্চয়ই সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।’ (সুরা লুকমান ১৯)।

একইভাবে মানুষের জন্য এমনভাবে গৃহনির্মাণ করা জায়েজ নয়, যা অন্যের বসবাসের জন্য হুমকি হতে পারে। তেমনি টেলিভিশন, রেডিও ইত্যাদির অতিমাত্রায় আওয়াজ করাও বৈধ নয়। কারণ তা প্রতিবেশীর শান্তি নষ্ট করে। উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি ও চিৎকারের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা সম্পর্কিত উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, ইসলাম শব্দদূষণের ব্যাপারে কতটা সতর্ক।

শব্দ দূষণরোধে যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ ও বিভিন্ন উৎস থেকে উৎপন্ন হওয়া শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ঐক্যবদ্ধ কর্ম প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত দিকনির্দেশনা শব্দদূষণকে নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। এ ছাড়া এমন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নিতে হবে, যা আমাদের সবুজ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। এখন শুধু প্রয়োজন পৃথিবীবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আসুন, আমরা মিলেমিশে একটি সজীব-সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি। পরের প্রজন্মকে সুন্দর ভুবন উপহার দেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত