হিসাববছরের শুরুতেই লোকসানে পড়েছে ইলেকট্রনিকস খাতের বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড। চলতি প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানিটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাড়লেও ব্যয়বৃদ্ধির জাঁতাকলে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি। উৎপাদন, পরিচালন, প্রচারণা, বিক্রি, সুদ, মিটিং-কনফারেন্সসহ সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে সিঙ্গারের। এতে চলতি প্রথম প্রান্তিকে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি, যেখানে কম বিক্রি নিয়েও আগের বছরের একই সময়ে ১১ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা হয়েছিল।
অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের আয় হয়েছে ৪০১ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিটির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের উৎপাদন ব্যয় ছিল বিক্রির ৭৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, যা চলতি প্রথম প্রান্তিকে ৭৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আয়ের বিপরীতে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৭৪ কোটি টাকা। তার পরও কোম্পানির আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০১ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
চলতি প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের পরিচালন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়েছে। মূলত বিজ্ঞাপন, বিক্রয় প্রচারণা ও সভা-সেমিনারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। এ ছাড়া বেতন-ভাতা এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ সময় বিজ্ঞাপন ও বিক্রয় প্রচারণায় সিঙ্গারের ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। বেতন-ভাতায় ব্যয় বেড়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে চলতি প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এ সময় কোম্পানির অন্যান্য আয় প্রায় একই রয়েছে।
পরিচালন ব্যয় সমন্বয়ের পর চলতি প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের পরিচালন আয় দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি বছরে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে সিঙ্গারের কোনো লোকসান হয়নি, উল্টো বেড়েছে। ১৫ লাখ টাকারও বেশি আয় হয়েছে এ খাতে। তবে সুদবাবদ ব্যয় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গারের সুদবাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১২ কোটি ২৮ লাখ টাকা। আর্থিক ব্যয় সমন্বয়ের পর কোম্পানিটির কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা কর-পূর্ববর্তী মুনাফা হয়েছিল।
চলতি বছর আয় বাড়লেও সিঙ্গারের কর পরিশোধের পরিমাণ কমেছে। এ সময় করবাবদ পরিশোধ করেছে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ৫ কোটি টাকারও বেশি। চলতি প্রথম প্রান্তিকে কর পরিশোধের পর সিঙ্গারের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ১১ কোটি ২৩ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল।
এদিকে প্রথম প্রান্তিকে লোকসানের কারণে সিঙ্গারের শেয়ারের দর কমে গিয়ে গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর প্রায় ৩ শতাংশ কমে গিয়ে ১৩৪ টাকা ৩০ পয়সায় নেমেছে। পুঁজিবাজার থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের আগে গত ১৬ জানুয়ারি সিঙ্গারের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের দাম ছিল ১৫৭ টাকা, যা গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর থেকেই শেয়ারটির দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে দেখা গেছে।
২০২৩ সালে সিঙ্গার বাংলাদেশ ৫০ কোটি টাকারও বেশি নিট মুনাফা করেছিল। শেয়ারপ্রতি আয় দাঁড়িয়েছিল ৫ টাকা ২৪ পয়সা। এই আয়ের ওপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ। ৯৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধের মূলধনের সিঙ্গারে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ৫৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারে বিদেশিদের বিনিয়োগ কমলেও বেড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ।
