‘টর্চার সেলে’ নিয়ে মুক্তিপণ আদায় ৬ পুলিশ সদস্যের!

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫৩ এএম

রাজধানীর পল্লবী থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই ব্যবসায়ী আদালতে করা মামলায় বলেছেন, কমান্ডো স্টাইলে তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা। তার অভিযোগ, স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে আটকে রেখে নির্যাতন করে আদায় করা হয়েছে মুক্তিপণ। ওই কমিউনিটি সেন্টারটি ‘টর্চার সেল’ বা ‘মিনি থানা’ নামে পরিচিত এলাকাবাসীর কাছে। সেখানে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্নজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হতো বড় অঙ্কের অর্থ।

সম্প্রতি তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে পল্লবী থানার তিন কর্মকর্তাসহ ছয় পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নেবে না ডিএমপি। পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলার পর ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত করে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রতিকার চেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ ও আদালতে মামলা করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে পল্লবী থানার এসআই শুভ, এসআই জিতু, এএসআই ফয়সালসহ ছয়জনকে। ওই ব্যবসায়ীর নাম আব্দুর রহিম। তিনি ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ব্যবসায়ী। অভিযোগে তিনি বলেন, পুলিশের স্থানীয় কিছু সোর্স ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে ছয় পুলিশ সদস্য সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে ধরে নিয়ে নির্যাতন করত। তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিত।

আব্দুর রহিমের অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৭ এপ্রিল দুপুরে তার ভাড়া বাসায় সাদা পোশাকে বেশ কয়েকজন প্রবেশ করে তাকে তুলে নিয়ে যায়। যার প্রমাণ সিসিটিভি ফুটেজে রয়েছে।

ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, ‘বহুদিন ধরে আমি পল্লবীর ৬ ও ৭ নম্বর সেকশনে ওয়ালটন ইলেকট্রনিক্সের শোরুম দিয়ে ব্যবসা করে আসছি। চার থেকে পাঁচ মাস ধরে পুলিশের সোর্স ও কিছু সন্ত্রাসী গোছের লোক আমাকে প্রকাশ্যে ও ফোনে বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি দেখানোসহ হুমকি দিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। কিন্তু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।’

এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘গত ৭ এপ্রিল দুপুরে কিছু লোক কমান্ডো স্টাইলে এসে আমার বাসায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে। আমাকে বলে, ‘তুমি স্বর্ণ নিয়েছ; স্বর্ণ দেও না কেন? স্বর্ণ টাকা-পয়সা কোথায় রাখছ বল।’ এসব বলে তারা আমাকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। বাসায় থাকা আমার ও আমার স্ত্রীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। পরে ওই সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা নিজেদের পুলিশ দাবি করে এবং বলে ‘তোর নামে মামলা আছে, তোর নামে ওয়ারেন্ট আছে, তোর বাঁচার কোনো উপায় নেই।’ তারা আমাকে মারতে মারতে ছয়তলা থেকে নামিয়ে মোটরসাইকেলে করে পল্লবীর ৭ নম্বর সেকশনের ৪ নম্বর রোডের ১৭-১৮ নম্বর প্লটে নিয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় সন্ত্রাসী শাহীন ও মাসুম পুলিশের সামনেই আমার গায়ে হাত তোলে। আমি চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন চলে আসে। এতে সন্ত্রাসীরা চলে যায়।

এরপর সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাকে ১১ নম্বর নান্নু মার্কেটের মেরিমেন্ট কমিউনিটি সেন্টারের নিচে নিয়ে যায় উল্লেখ করে ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, ‘পরে এসআই শুভ, এসআই জিতু, এএসআই ফয়সাল ও কনস্টেবল তোফায়েলসহ আরও চার থেকে পাঁচজন লোক আমাকে গালাগালসহ হুমকি দেয় এবং মারধর করে। আমাকে তাদের টর্চার সেলে আটকে রাখে। একপর্যায়ে আমাকে বলে যে, ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। তারা বলে, ‘টাকা দিলে তোর বিরুদ্ধে কোনো মামলা, কোনো অভিযোগ থাকবে না।’ আমি টাকা দিতে না চাইলে পুলিশ আমাকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাতে থাকে।

অন্যদিকে পরিবারের লোকজন খুঁজে না পেয়ে তার স্ত্রী জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯- এ কল করে জানিয়ে আব্দুর রহিম বলেন, ‘ওই ফোন করার পরেই সাদা পোশাকের পুলিশরা আমাকে থানার হাজতখানায় নিয়ে আটকে রাখে। পরে ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে আমার স্ত্রীসহ আত্মীয়রা থানায় যায়। আমাকে থানার হাজতখানা থেকে চতুর্থতলায় নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রেখে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। তারা আমাকে বলে, ‘টাকা না দিলে তোর নামে মামলা দিয়া সাত দিনের রিমান্ডে এনে শারীরিকভাবে এমন অবস্থা করব যে, জীবনে আর কিছু করে খেতে পারবি না। এসআই শুভ ও জিতু শেষমেশ আমার কাছে ১ লাখ টাকা চায়। আমার বড় বোন আয়শা আক্তার শিল্পী তাদের ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমাকে ছেড়ে দেয়।’

এই অভিযোগে বিষয়ে জানতে এসআই জিতুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া মেলেনি।

ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, ‘প্রথমে ওই ব্যক্তিদের ভুয়া পুলিশ মনে হয়। একপর্যায়ে নিশ্চিত হই যে, তারা প্রকৃতই পুলিশ। তারা প্রথমে বলেনি যে পল্লবী থানা থেকে আসছে। শুধু আমাকে নয় মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার মেরিমেন্ট কমিউনিটি সেন্টারে অন্ধকার কক্ষে আমার মতো আরও বহু মানুষে আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ নেওয়া হয়। কমিউনিটি সেন্টারের নিচতলায় একটা অন্ধকার কক্ষ আছে। যেখানে একটা মানুষ স্বাভাবিকভাবে গেলেই ভয় পাওয়ার মতো অবস্থা। ওটা তাদের টর্চার সেল। আমি থাকা অবস্থায়ই আরও দুজনকে নিয়ে এমনভাবে নির্যাতন করেছে। তাদের কাছেও ১৫ লাখ টাকা করে দাবি করে।’

এ বিষয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জসীম উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘কেউ অপরাধ করলে তার দায় বাহিনী নেবে না। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত