বাংলাদেশের সড়কগুলোতে দিন দিন মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঈদযাত্রায় ৩৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত আর ১ হাজার ৩৯৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই বেশি, ১৯৮টি; এতে ১৬৫ জন নিহত এবং ২৪০ জন আহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মোটরসাইকেল মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেক এবং বাইক অপঘাতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা মোট নিহতের ৪০ শতাংশেরও বেশি। গত ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হয়েছিলেন। গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ৩১ শতাংশ, প্রাণহানি ২৪ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা প্রায় দেড়শ গুণ বেড়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩২ শতাংশের বেশি হয় জাতীয় মহাসড়কে। এর পাশাপাশি ১০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ৫০ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়।
আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে মোট ছয় হাজার ৮২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৭১৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই হাজার ৯৭৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন হাজার ৯১ জন ব্যক্তি। নিহতের মধ্যে ৭৫ শতাংশই ১৪ থেকে ৪৫ বছর বয়সী। এখানে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বলছে ২০২১ সালে ৫,৯৩২ জন মোটরসাইকেল চালক নিহত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২৬ জন বেশি। অর্থাৎ, বাংলাদেশ অত্যন্ত ছোট দেশ হলেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিহতের সংখ্যার সমানুপাত হিসেব করলে বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল। জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় ঈদে যাতায়াতকারী ব্যক্তিগত যানের চালকদের জাতীয় সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালানোর কারণে রাতে দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। জাতীয়, আঞ্চলিক ও ফিডার রোডে টার্নিং চিহ্ন না থাকার ফলে নতুন চালকরা এসব সড়কে দুর্ঘটনায় শিকার হয়েছেন। এর সঙ্গে আছে সড়কে ক্লান্ত চালকের দেদার উপস্থিতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালক সড়কে, মহাসড়কে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অনেক দুর্ঘটনা অনুসরণ করলে দেখা যাবে সেগুলো ‘অবহেলাজনিত হত্যাকান্ড’। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একগুচ্ছ সুপারিশও করেছে সমিতি। তারা বলছে, জরুরি ভিত্তিতে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করতে হবে, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় সাবলীল চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থার পাশাপাশি সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়।
চার লেন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়িয়েছে
ড. মোহাম্মদ শাহীন সরকার, বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (সওজ) দেশ রপান্তরকে বুধবার বলেন, দেশে অনেক সড়ক চার লেন করার পর কিছু দুর্ঘটনা বেড়েছে। চার লেন হওয়ার পর অনেক চালকই নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি। কোনো কারণে কোনো স্থানে বাধা (Obstruction) তৈরি হলে পেছনের দ্রুতগতির গাড়ি হঠাৎ করে সমস্যায় পড়ছে। আবার নতুন নতুন ইন্টারসেকশনগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটছে অনভ্যস্ততার কারণে। তবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে কারণ তরুণ বাইক চালকরা গতিসীমা মেনে চলছেন না। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চালকের লাইসেন্সে পয়েন্টের ব্যবস্থা থাকা দরকার। যেসব চালক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হবেন, তাদের লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটা যেতে পারে এবং প্রয়োজনে তাদের রিফ্রেশিং কোর্স বা প্রবেশনে পাঠানো যেতে পারে। তবে এই উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে।
ছুটির সময়ে বিশেষ সতর্কতার নজর দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে যথেষ্ট সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ নেই। বর্তমান ট্রাফিক ব্যবস্থায় আরও বেশি পুলিশ দরকার। ট্রাফিক মার্কিং, ওভারহেড ট্রাফিক বিলবোর্ড, সড়কের উভয় পাশে Rumble Strip বা সড়ক গর্জন ব্যবস্থা চালু করা এবং সড়কে Cat’s Eye Reflector (যা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে এবং উল্টোপথে গেলে লাল সিগন্যাল দেখায়) বসাতে হবে।
শাহীন সরকার বলেন, একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে দুটি মহাসড়কে ডিজিট্যাল ট্রাফিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। এটি চালকের ছবি তোলা, গাড়ির নম্বর প্লেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ছবি তুলে কন্ট্রোল রুমে পাঠাবে। এক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করা সহজ হবে। পাইলট প্রকল্পটি এখন থেকে দুই বা তিন বছরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান।
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মোটরসাইকেল রয়েছে। প্রায় ৪ লাখ প্রাইভেট কার, ৫২ হাজার বাস, ৩০ হাজার মিনি বাস ও ১ লাখ ৬০ হাজারের মতো ট্রাক রয়েছে । সরকারি হিসাব মতে, দেশে ট্যাক্সি ক্যাবের সংখ্যা ৪৫ হাজার। BRTA-এর হিসেবে রেজিস্ট্রিকৃত যানবাহনের সংখ্যা ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫ লাখ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে কোনো কোনো মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় ভারত ও চীনের তুলনায় দুই থেকে নয় গুণ এবং ইউরোপে ব্যয়ের দ্বিগুণ বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি এই দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই কম। এদিকে পদ্মা বহমুখী সেতুর নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দুঃখজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হিসাব মতে, ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ এক বছরে যে দুর্ঘটনা ঘটে তা দিয়ে একটি করে পদ্মা ব্রিজ নির্মাণ সম্ভব। সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। এ জন্য এই সমস্যা এখন শুধু মানবিক নয়, বড় অর্থনৈতিক সমস্যাও বটে! পুরো পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় ৩,৭০০ মানুষ সড়ক দুর্ঘনায় নিহত হচ্ছেন আর বছরে এই সংখ্যাটি হলো ১৩ লাখেরও বেশি। এদিকে ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাফিক দুর্ঘটনায় ৪৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা কিনা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ কম। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রে নানা রকম যানবাহনের সংখ্যা ২৮ কোটিরও বেশি । অপরদিকে ২৭টি দেশের সংগঠন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০,৬৫৩ জন নিহত হয়েছেন, যা কিনা ২০২১ সালের তুলনায় ৩.৭ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় অর্ধেক ছিলেন যাত্রীবাহী গাড়ির চালক বা যাত্রী।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক আন্দোলনের সূচনা
সড়ক দুর্ঘটনায় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশের প্রথম সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করে। এই ট্র্যাজেডির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইলিয়াস কাঞ্চন ১৯৯৩ সালের পহেলা ডিসেম্বরে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলন শুরু করেন। এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, ২০০৭ সালে সেভ দ্য রোড এবং ২০১৭ সালে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা একটি যৌথ অন্দোলন গড়ে তোলে।
নিরাপদ সড়কের জন্য ২০১৮ সালে বেশ সাড়া জাগানো আন্দোলন করেছিল শিক্ষার্থীরা। যার ফলশ্রুতিতে সড়কের নিরাপত্তায় শাস্তি বহু গুণ বাড়িয়ে আইন করার সুপারিশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৭ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আকাশপথে ভ্রমণ বেশি নিরাপদ
প্রথমত, বেশিরভাগ মহাসড়ক এবং রাস্তায় গাড়ির ঘনত্ব অনেক বেশি, যার মানে একে অপরের কাছাকাছি গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বা সংঘর্ষের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে যে কোনো সময়ে আকাশে বিমানের ঘনত্ব অনেক কম থাকে। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে খুব বেগ পেতে হয় না। কিন্তু একজন পাইলটের লাইসেন্স পাওয়া বা উড়োজাহাজ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাওয়া যতটা কঠিন তা সড়ক পথের চালকের সঙ্গে মোটেও তুলনীয় নয় ।
বিমান প্রকৌশলী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড প্যাক্সটন
সড়কপথের দুর্ঘটনা নিয়ে ইংল্যান্ডের বিমান প্রকৌশলী এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড প্যাক্সটন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। তিনি বলছেন, বিশ্বব্যাপী উড্ডয়ন নিরাপত্তা অবিশ্বাস্য রকম ভালো। চিন্তা করে দেখুন, প্রতিদিন প্রায় ১.১ কোটি মানুষ বিমানে ভ্রমণ করছেন, আর সড়কপথে প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩,৭০০ জন। এসব দুর্ঘটনার সঙ্গে গাড়ি (কার), বাস, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, ট্রাক বা পথচারীরা জড়িত। প্যাক্সটন বলেছেন, অভিজ্ঞ পাইলট দুটো বিষয় সবসময় মাথায় রাখেন—নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় এবং সর্বদা ইতিবাচক সন্দিহান (Paranoia)-এর মধ্যে থাকা। অর্থাৎ সড়কে থাকা অবস্থায় আমরা সংশয়বাদ এবং প্যারানয়ার একটি স্বাস্থ্যকর ডোজ মাথায় রাখতে পারি। এটিই যেমন পাইলটদের তাদের বিমান নিরাপদে রাখে রাস্তাতেও কেউ যদি ভাবেন সামনের গাড়িটি যদি এখনই লেন পরিবর্তন করে, অথবা আমার চাকা যদি ফেটে যায় তাহলে কী হবে? তাই আমার গতি সীমিত রাখলে তবেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে আমি বেঁচে যেতে পারি। ভালো নিরাপত্তা রেকর্ড রয়েছে এমন পাইলটরা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী নন এবং তারা নিরাপত্তা চেকগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের শর্টকার্ট প্রয়োগ করেন না।
তিনি আরেকটি উপদেশ দিয়েছেন, তাহলো যখন কোনো চালক কোনো দুর্ঘটনা থেকে আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যান, তখন তার উচিত সেই অভিজ্ঞতার কথা অন্য চালকদের জানিয়ে দেওয়া। এতে করে অন্যরা Near Miss Accident থেকে সাবধানতা অবলম্বন করবেন। চালকদের এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ করে দিতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে লাগামহীন দুর্ঘটনা রোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। এটিই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
