বুর্জোয়া শাসনাধীনে নির্বাচনী সংস্কৃতি

আপডেট : ০৩ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

বুর্জোয়া শাসনাধীন সারা বিশ্বে বুর্জোয়ারা নির্বাচন দিয়ে থাকে; তাদের জন্য সেটা এক ধরনের খেলা বৈ নয়। বুর্জোয়ারাই খেলে এবং তারাই জেতে এনামে ওনামে। প্রতীক ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু পরিচয় অভিন্ন। জনগণকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। জনগণ ভোট যে দেয় না তাও নয়, কিন্তু একেবারে অবধারিতভাবেই হেরে যায় ওই জনগণই।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রশাসকরাও নির্বাচিত হয়েই ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনে তারা যে বর্বরতম গণহত্যা অবিশ্বাস্য গতিতে পরিচালনা করছে সেটাই হচ্ছে বুর্জোয়া শাসকদের আসল চরিত্র। গাজার ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির ভেতর ইতিমধ্যেই ৩৫ হাজার প্রাণ হারিয়েছে, বহুজন আহত, অনেকেই অপেক্ষা করছে মৃত্যুর। কম করে হলেও ১৭ হাজার শিশু আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। বাবা নেই, মা নেই এমন শিশুরা বলছে তারা মরে যেতে চায়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে সবচেয়ে অনমনীয় ও সোচ্চার যে রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তারা এই গণহত্যায় বিরোধিতা করবে কী, উল্টো মদদ জুগিয়ে চলেছে। এ ব্যাপারে বাইডেন-ট্রাম্পে কোনো ফারাক নেই। অস্ত্র মার্কিনিরাই সরবরাহ করছে। অর্থাৎ অস্ত্র বিক্রি করছে। এ রকম গণহত্যা ঘটলে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের লাভটাই সর্বাধিক; তারা সেই লাভ হাতে পেয়ে আহ্লাদিত। খোদ আমেরিকাতেই বন্দুক তৈরিকারীদের দাপটের চোটেই তো দেশটিতে বন্দুক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আর মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিদের আপনজন বলে কথিত, তারা, বিশেষ ভাবে রাজা-বাদশাহ এবং শাসনকর্তারা, দেখেও দেখছে না। সাড়া-শব্দ নেই। কারণ তারাও পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ করতে আগ্রহী। একেবারে ভাই ভাইর সম্পর্ক হতে পারবে না ঠিকই, রক্ত এক নয়, আবার ধর্মীয় পার্থক্যও রয়েছে; কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে তো বাধা নেই এবং পৃথিবীতে ভাইয়ে ভাইয়ে যত ঝগড়া হয় বন্ধুতে বন্ধুতে তত হয় না। হ্যাঁ, প্রতিবাদ হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীই প্রতিবাদ হচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরও মনুষ্যদরদি মানুষ আছেন, যারা প্রতিবাদ করছেন, কিন্তু তারা তো সংখ্যায় অল্প; তদুপরি রাষ্ট্র একপায়ে খাড়া তাদের হেনস্তা করতে। গণমাধ্যমেও তারা প্রশ্রয় পান না।

বাংলাদেশেও একটি নির্বাচন আমরা দেখলাম। কারা জিতবে সেটা তো জানাই ছিল। জিতেছেও; আগে যেমন জিতেছে, এবারও তেমনি; কৌশলেরই যা অল্প-স্বল্প ইতর বিশেষ ঘটেছে। সরকারি দলের প্রধান মুখপাত্র বড় সুন্দর করে আশ্বাস দিচ্ছিলেন যে, জনগণ বেশ জমজমাট একটা খেলা দেখতে পাবে; কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি, কারণ যাদের সঙ্গে খেলা হওয়ার কথা তাড়া খেয়ে সেই দলের নেতারা মাঠে থাকবে কী, ঢুকে পড়েছে জেলখানাতে; কর্মীরা গা ঢাকা দিয়েছে যে যেখানে পারে।

তবে নির্বাচন যেহেতু একটা খেলা-ই বটে, তাই প্রতিপক্ষের দরকার ছিল। চৌদ্দ দল তো প্রতিপক্ষ নয়, সরকারি জোটেরই অংশ, তাদের তাই এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দাঁড় করাবার কোনো উপায় ছিল না। জাতীয় পার্টিও সরকার-আশ্রিত ‘বিরোধী দল’ বটে। তারাও তাই স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে সাহস করেনি, সরকারের কাছ থেকে অনুমতি তথা ছাড় নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শামিল হয়েছে। তবে সুবিধা করতে পারেনি। পারবে না যে সেটাও তো জানাই ছিল। নিরুপায় হয়ে সরকার নিজের দল থেকেই একটা বিরোধী পক্ষকে নির্বাচনে দাঁড়াতে উৎসাহ দিয়েছে। দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিল কিন্তু পায়নি এমন প্রার্থীদের উৎসাহিত করেছে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে। আগের দিন হলে এদের ‘বিদ্রোহী’ বলে শনাক্ত করে শাস্তি দেওয়া হতো; এবার দেওয়া হয়েছে উৎসাহ। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেটুকু হওয়ার এদের সঙ্গেই হয়েছে; ভালো সংখ্যক প্রার্থী জিতেছেও; এমনও গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল যে, স্বতন্ত্ররা একাট্টা হয়ে বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে তেমনটা ঘটা মোটেই সম্ভব ছিল না; কারণ স্বতন্ত্ররা তো আওয়ামী লীগেরই লোক, তারা সরকারি দল ছেড়ে বিরোধী সেজে প্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে কেন? কেনই-বা ঝুঁকি নেবে নিপীড়নের? ব্যতিক্রমী এমন ঘটনা ওই একবারই ঘটেছিল, যখন জাসদ গঠিত হয়; কিন্তু নদী শুকিয়ে যেতে পারে ঠিকই, তাই বলে পেছনে সরে যাবে এটা তো স্বাভাবিক নয়। যা স্বাভাবিক তাই ঘটেছে, স্বতন্ত্ররা সরকার সমর্থকই রয়ে গেছে; বিরোধী দল গঠন করেনি।

আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে উগ্রপন্থি দুয়েকজন আওয়াজ তুলেছিলেন বিএনপিকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হোক। তবে তাদের মধ্যে বিচক্ষণ যারা, তারা ঠিকই বুঝেছেন যে, বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী বটে, তবে শত্রু নয়; শত্রু হচ্ছে কমিউনিস্টরা এবং ইসলামপন্থিরা। কমিউনিস্টরা হঠাৎ করে শক্তিশালী হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা নেই, তবে বিএনপি না থাকলে ইসলামপন্থিরা যে শূন্যস্থানটা পূর্ণ করবে এমন আশঙ্কা তো থেকেই যাবে। তেমন উত্থান নিশ্চয়ই মঙ্গলজনক হবে না।

নির্বাচন পাকিস্তানেও হয়েছে। সেখানে ইমরান খানের দল জিতবে এমনটাই ধারণা ছিল। তারা জিতেছে বটে, তবে প্রত্যাশিত মাত্রায় নয়। কারণ সরকারের ভেতরে যে সরকার আছে পাকিস্তানে, অর্থাৎ সেনাবাহিনী, খান সাহেবকে তারা জয়ী হিসেবে দেখতে চায়নি। ইমরান খান নিজে কারাবন্দি, তার দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি, দলের প্রার্থীদেরও দলীয় প্রতীকে লড়ার সুযোগ ছিল না, তারা  ভোট চেয়েছেন বিভিন্ন প্রতীকের পক্ষে। প্রকাশ্যে চাওয়াতে বিঘœ ছিল, অনেকেই আত্মগোপনে থেকে প্রচার করেছেন, কেউ কেউ কারাগারে থাকা অবস্থায় ভিডিও মারফত আবেদন জানিয়েছেন। এত সব প্রতিবন্ধকতার মুখেও জনরায় ইমরান খানের পার্টির পক্ষেই গেছে। আমরা বাংলাদেশিরা কখনো কখনো বুক ফুলিয়ে বলে থাকি যে, পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার অনেক জিনিস আছে। নাকি গোপনে গোপনে শিক্ষা তারা নিচ্ছেও। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষা নিচ্ছে সে ব্যাপারে আমরা অবশ্য নিশ্চিত নই; তবে দেখা যাচ্ছে যে, একটা ব্যাপারে তারা শিক্ষা কিছুটা নিয়ে থাকবে সেটা হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। আমরা অবশ্য ইতিমধ্যে ‘অপরের জন্য শিক্ষণীয়’ ওই ব্যবস্থাটা পরিত্যাগ করে বেশ কিছু দূর এগিয়ে গেছি, তবে ইমরান খানের পতনের পর পাকিস্তানের যারা শাসক তারা এক ব্যক্তিকে প্রধান করে একটি অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বসিয়েছিল যার অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, এই অভিযোগ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই উঠেছে। বিশেষ করে এই জন্য যে, একপর্যায়ে নির্বাচনের ফল প্রকাশ থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সম্পূর্ণ ফল প্রকাশে এক দুই নয়, দশ দশ ঘণ্টা বিলম্ব ঘটেছিল। ইমরান খানের দল কারচুপির অভিযোগের আওয়াজটা থামিয়ে দেয়নি এবং কারচুপির প্রমাণ তো এটাও যে, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা পদত্যাগ করে দায়মুক্ত হতে চেয়েছেন।

তবে পাকিস্তানের রাজনীতির বিষয়ে ইমরান খান যে জ্ঞানটি সহজেই নিতে পারেন সেটা হলো, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভয়ংকর নিষ্ঠুর ও ক্ষমতালিপ্সু একটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো মিথ্যা কথা কিছু কম বলেননি; কিন্তু অন্তত একটি মোক্ষম সত্য কথা বলেছিলেন; সেটা হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দল। তিনি বলেছিলেন; পাকিস্তানে তিনটি রাজনৈতিক দল আছে, একটি তার নিজের দল, অপরটি আওয়ামী লীগ এবং তৃতীয়টি সামরিক বাহিনী। যোগ করতে পারতেন এই সত্য কথাটাও যে, ওই তৃতীয়টি ছাগলের তৃতীয় সন্তান নয়, এমনকি প্রথম সন্তানও নয়; ওটিই ছাগলের আসল মালিক। আর ওই মালিক যে কেমন রক্তলোলুপ হতে পারে তা একাত্তরে বাঙালিরা জেনেছিল গণহত্যার মুখে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে। আর ওই গণহত্যার প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন ইমরান খানেরই আপন চাচা, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা লে. জে. নিয়াজী। ইমরান খান যে সেই গণহত্যার নিন্দা করেছেন এমনটা শুনিনি; চাচার গৌরবে ভাতিজা মনে হয় গর্বিতই ছিলেন; থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। ভাতিজা এখন টের পাচ্ছেন ওই বাহিনী কী জিনিস। টের অবশ্য পেয়েছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজেও; আপন প্রাণের বিনিময়ে। সামরিক বাহিনীকে গণহত্যায় তিনি উসকানি দিয়েছেন এবং পরে ওই বাহিনীর হাতেই নিহত হয়েছেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষমতায় এসেছিলেন সেনাবাহিনীর সহায়তা পেয়েই, প্রাণও দিলেন তাদের হাতেই; ইমরান খান যে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন পাকিস্তানের তার পেছনেও সেনাবাহিনীর সমর্থন ছিল। তাদের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হওয়ার দরুনই প্রধানমন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন এবং এখন আটক অবস্থায় রয়েছেন জেলখানাতে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যে একজন নিষ্কলঙ্ক পুরুষ এমন দাবি তিনি নিজেও করেন না; তবে পাকিস্তানের দুর্ভাগ্য এমনই যে, তিনি এখন ‘গণতন্ত্র উদ্ধারের’ জন্য গঠিত সংগ্রামের নায়কে পরিণত হয়েছেন।

পাকিস্তান ভেঙে গেছে একাত্তরে এবং পাকিস্তানের বর্তমান অংশও টিকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সংশয় অবশ্য শুরু থেকেই ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং পাকিস্তানি জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উঁচু গলায় ঘোষণা দিয়েছিলেন পাকিস্তান টেকার জন্যই এসেছে; তবে ওই বুলন্দ আওয়াজের নীরব একটি প্রতিধ্বনি তখনই উঠেছিল; সেটা হলো ‘পাকিস্তান কিছুতেই টিকবে না।’ প্রতিধ্বনিটিই পরে মূল ধ্বনিতে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান যদি আরও ভাঙে তাহলে সেটা ঘটবে ঠিক সেই কারণেই, যে কারণে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান ভেঙে বের হয়ে এসেছে। সেটা হলো জাতিগত নিপীড়ন। পাকিস্তানে এখন যা চলছে সেটাও অন্য জাতিগুলোর ওপর পাঞ্জাবিদের শাসনই। পাঞ্জাবিদের সবচেয়ে সুগঠিত দল হচ্ছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত