বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি এবং বসে থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্র ভাড়া) পরিশোধ করা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশে সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল। তবে তেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি তুলে নিতে সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বাংলাদেশ তেল-গ্যাস খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। ওইসব বৈঠকে বিষয়গুলো উঠে এসেছে বলে মন্ত্রণালয় এবং পেট্রোবাংলার একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। ওই সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি কমানো, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করাসহ বেশ কিছু শর্ত দিয়েছিল তারা। এর আগে গত বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশের জন্য ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। আইএমএফের পরামর্শে এরই মধ্যে নির্বাহী আদেশে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে একাধিকবার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতি মাসে দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হয়েছে।
২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৩ বছরে ৭ কিস্তিতে পাওয়া যাবে ৪৭০ কোটি ডলার। এর মধ্যে দুই কিস্তির অর্থ পাওয়া গেছে। আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তির অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং অন্যান্য খাতে সংস্কারের জন্য যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছিল, সরকার সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, তা পর্যালোচনা করতে প্রতিনিধিদলটি ঢাকা সফরে এসেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বেলা ১১টার দিকে প্রথমে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধিদল। জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. নুরুল আলম উপস্থিত না থাকায় অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মকর্তা বৈঠকে অংশ নেন।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করে জ্বালানি খাতে যে ভর্তুকি রয়েছে, সেটিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আইএমএফ। বাংলাদেশকে ঋণ পেতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হবে বলে প্রতিনিধিদলকে জানানো হয়েছে।
পরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির গবেষণা বিভাগের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি শাখার প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিওয়। আর বিদ্যুৎ বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন সিনিয়র সচিব হাবিবুর রহমান।
বৈঠক সূত্র জানায়, আইএমএফ প্রতিনিধিদল বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়েও জানতে চায়। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ দুটি বিষয় তাদের জানানোর পর আইএমএফ প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অব্যাহত লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ায় বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের আগেও পিডিবির আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল আইএমএফ।
বিকেলে পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠকে আমদানীকৃত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এবং দেশের ভেতর কাজ করা আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানির বকেয়া পরিশোধ করতে না পারার কারণ জানতে চায় আইএমএফ। পেট্রোবাংলা থেকে ডলারসংকটের কথা জানানো হয়। বৈঠকে পেট্রোবাংলা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা দেশে রূপান্তরকে বলেন, আইএমএফের প্রতিনিধিদলটি পেট্রোবাংলার সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে ২০৪১ সাল পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলন, এলএনজি আমদানি, সরবরাহ, বিক্রি ও রেভিনিউ আদায়ের বিষয়টি একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া জ্বালানি খাতে সামগ্রিক সংস্কারের বিষয়টিও উত্থাপন করা হয় প্রতিনিধিদলের কাছে।
পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠক শেষে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বিপিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় প্রক্রিয়া ও এ খাতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
