গাজীপুরে ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে তেলবাহী ও যাত্রীবাহী দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সদর থানার জয়দেবপুর আউটার সিগন্যালের কাজীবাড়ি ছোট দেওড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ট্রেনের এক চালকসহ অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় যাত্রীবাহী ট্রেনের চারটি বগি এবং তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
এ ঘটনায় স্টেশন মাস্টারসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর দুই ঘণ্টা ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে অন্য একটি লাইন দিয়ে এই দুই রেলপথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
জয়দেবপুর রেল জংশনের স্টেশন মাস্টার হানিফ আলী জানান, টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেন বেলা ১১টায় জয়দেবপুর স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। ট্রেনটি স্টেশন থেকে ছেড়ে আউটার সিগন্যালে পৌঁছানোর পর লাইন ক্রসিং করার সময় কাজীবাড়ি ছোট দেওড়া এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রেনের (তেল বহনকারী) সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে যাত্রীবাহী ট্রেনটির চালকসহ আহতদের উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে তিনজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন শরীফ মাহমুদ (৩৮), হাবিবুর রহমান (৫৮) ও সবুজ হাসান (৪৬)।
দুর্ঘটনায় যাত্রীবাহী ট্রেনের চারটি বগি এবং তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়। বিকেলে ঢাকা থেকে রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। এর আগে দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টা পর একটি লাইন থেকে লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে দিলে এক লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।
দুর্ঘটনাকবলিত তেলবাহী ট্রেনের প্রত্যেকটি ট্যাংকারেই তেল আছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মো. সফিকুল ইসলাম। দুর্ঘটনায় একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন জেলা প্রশাসক। পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকজন ঘটনাস্থলে এসে করণীয় সম্পর্কে মতামত দেবেন।
যাতে বড় কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে সেজন্য ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তেল স্থানান্তরের কাজ করার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘এখন প্রচুর গরম, এ বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা লোকদের সরিয়ে দিয়েছি। একটি অয়েল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেল চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে, এটাকে আগে স্থানান্তর করা, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবাই এখানে আছে। তারা পুরো বিষয়টি দেখভাল করছে, রেল বিভাগ যাতে এখানে সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল আরেফিন জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর দুই প্লাটুন বিজিবি ও র্যাবের কয়েকটি টিম ঘটনাস্থলে যায়।
স্টেশন মাস্টারসহ তিনজন বরখাস্ত : দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনের আবগোমটি স্টেশন মাস্টারসহ তিনজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার হানিফ আলী জানান, জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনের আবগোমটি স্টেশন মাস্টার মো. হাশেম এবং পয়েন্টম্যান সাদ্দাম হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানকে বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ।
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি : তেলবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক। গতকাল দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল ফাতেহ মো. সফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মতিউর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘটনা করা হয়েছে। এই কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই কারও না কারও ভুলেই এই কাজটি হয়েছে, এটা টেকনিক্যাল ভুল থাকলে সেটাও আমরা ধরতে পারব, আর কারও ভুলে হয়ে থাকে রেল কর্র্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এখন পর্যন্ত আমরা যতটুকু জেনেছি যে লাইনে তেলবাহী ট্রেনটি ছিল টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনটি একই লাইনে প্রবেশ করে। দুর্ঘটনার কারণটা মূলত এটাই।’
