সকালের ট্রেন বিকেলেও ছাড়েনি ৩২ ঘণ্টার দুর্ভোগ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৪, ০৪:১৩ এএম

গাজীপুরের জয়দেবপুরে ট্রেন দুর্ঘটনা ও দুদিন আগে বগুড়ার সান্তাহার স্টেশনে রেলকর্মীদের মারধরের পর থেকে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলো ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে গতকাল শনিবার ছিল সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। রাজধানীর কমলাপুরের ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন থেকে দৈনিক ৫৩টি ট্রেন ছেড়ে গেলেও গতকাল মাত্র ৪টি ট্রেন সঠিক সময়ে ছেড়ে গেছে। বাকি অর্ধশত ট্রেনের অধিকাংশই ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিলম্বে, এমনকি ৭-৮ ঘণ্টা বিলম্বেও ছেড়েছে কোনো ট্রেন।

এদিকে জয়দেবপুরে সংকেতের ভুলে তেলবাহী ও যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ৩১ ঘণ্টা পর উদ্ধারকাজ শেষ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনের মেরামত শেষে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গত শুক্রবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে গাজীপুর মহানগরীর জয়দেবপুর জংশনের দক্ষিণে ছোট দেওড়া আউটার সিগন্যালে উত্তরবঙ্গগামী তেলবাহী ট্রেন ও ঢাকাগামী টাঙ্গাইল কমিউটার যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে দুটি ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং ট্রেনের চালকসহ চারজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর থেকে ঢাকার সঙ্গে ময়মনসিংহ, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর স্টেশনে অপেক্ষারত যাত্রীদের ভোগান্তি শেষ হয়।

গতকাল বিকেলে কমলাপুরে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের সময়সূচিতে দেখা গেছে, রংপুর এক্সপ্রেস প্রায় সাত ঘণ্টা বিলম্বে ছিল। সকাল ৯টা ১০ মিনিটের এ ট্রেন বিকেল ৪টায়ও ঢাকা ছাড়তে পারেনি।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলেন, লাইন ক্লিয়ার না হওয়ার কারণে জয়দেবপুর হয়ে যে ট্রেনগুলো যাতায়াত করে, সেগুলোর বিলম্বে ছেড়েছে। শুক্রবার থেকেই এসব ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে।

গতকাল কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সন্তান ও স্বজন নিয়ে কেউ বসে আছেন, কেউবা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছেন বসার জায়গা না পেয়ে। স্টেশনের ভেতর অনেক যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মাসুদ সারওয়ার বলেন, ‘উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব ট্রেনই ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিলম্বে ছাড়ছে। এখনো লাইন পুরোপুরি ঠিক হয়নি। সকাল থেকে এ রুটে ৮টি ট্রেন ছেড়ে গেছে, আর সবগুলোই বিলম্বে চলছে।’

ট্রেন বিলম্বে ছাড়ায় গতকাল ছুটির দিনেও কমলাপুর স্টেশনে ছিল যাত্রীদের ভিড়। সাধারণত দিনে ৫৩টি ট্রেন কমলাপুর স্টেশনে থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছেড়ে যায়। তবে জয়দেবপুরে দুর্ঘটনার কারণে গতকাল সব ট্রেনই বিলম্বে ছেড়েছে। এসব ট্রেন ঢাকায় পৌঁছেছেও বিলম্বে।

সকাল ৬টার রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস সকাল ৮টায়, ৬টা ১৫ মিনিটের কক্সবাজারগামী পর্যটন এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৮টায়, ৬টা ৪৫ মিনিটের চিলাহাটিগামী চিলাহাটি এক্সপ্রেস ৯টায়, ৭টা ১৫ মিনিটের নীলফামারীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস সাড়ে ৯টায় এবং চট্টগ্রামগামী ৭টা ৪৫ মিনিটের মহানগর প্রভাতি ১০টার দিকে ছেড়ে যায়।

৩১ ঘণ্টা পর শেষ উদ্ধারকাজ : জয়দেবপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার হানিফ আলী জানান, শুক্রবার তেলবাহী ওয়াগন ও যাত্রীবাহী টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনের সংঘর্ষের পর জয়দেবপুর স্টেশন দিয়ে ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম রুটের ট্রেন চলাচল ২ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। বিকেলে রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছার পর উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। গতকাল সারা দিন উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকে। দুর্ঘটনার পরপরই টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনের পেছনের অংশের অক্ষত বগিগুলো বিকল্প ইঞ্জিনের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। পরে রাতভর উদ্ধার অভিযানে তেলবাহী ওয়াগনের লাইনচ্যুত ৫টি বগির মধ্যে তিনটি বগি অপসারণ করে পার্শ্ববর্তী স্টেশনে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া যাত্রীবাহী টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত ৪টি বগি রেললাইনের পাশে রাখা হয়।

গতকাল দুপুরে জয়দেবপুর রেল জংশনে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন জেলার শত শত যাত্রী ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারা নির্ধারিত সময়ে ট্রেন স্টেশনে না আসায় অপেক্ষা করছিলেন। অনেকে স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছিলেন তাদের ট্রেন কখন আসবে। কিন্তু কোন ট্রেন কখন আসবে, তা রেল কর্মকর্তারাও সঠিকভাবে বলতে পারছিলেন না। একদিকে যাত্রীদের চাপ, অন্যদিকে দুর্ঘটনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ওপর মহলের চাপে তাদের দিশাহারা অবস্থা।

জামালপুরগামী তিস্তা ট্রেনের যাত্রী এনামুল করিম গ্রামের বাড়ি জামালপুরে যাওয়ার জন্য স্টেশনে অপেক্ষায় বসে ছিলেন। সকাল সাড়ে ৭টায় জয়দেবপুর জংশন থেকে ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দুপুরেও তার ট্রেন স্টেশনে আসেনি।

জয়দেবপুর রেলস্টেশনের কর্তব্যরত স্টেশন মাস্টার আল ইয়াসবাহ বলেন, ‘এক লাইনে ট্রেন চলাচলের কারণে ঢাকা থেকে নেত্রকোনায় চলাচলকারী মহুয়া কমিউটার, ঢাকা-জয়দেবপুর চলাচলকারী তুরাগ কমিউটার এবং ঢাকা-জামালপুর চলাচলকারী জামালপুর কমিউটারের গতকালের উভয়মুখী যাত্রা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা প্রায় তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়েছে।’

জয়দেবপুর রেলওয়ে জংশনের সিগন্যাল ইন্সপেক্টর মো. রফিকুল ইসলাম জানান, একই লাইনে দুদিকে ট্রেন চলাচলের কারণে শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

জয়দেবপুর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. হানিফ মিয়া বলেন, ‘দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টা পর এক লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একটি লাইন বন্ধ থাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী ধীরাশ্রম স্টেশন এবং জয়দেবপুর জংশনে ট্রেন অপেক্ষায় রেখে একটি করে ট্রেন দুদিকে চলতে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে কোনো ট্রেনেরই শিডিউল ঠিক থাকছে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত